প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের উত্তেজনা দিন দিন বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজিত হতে যাওয়া এই আসরকে ইতোমধ্যেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে ১০৪ ম্যাচের এই টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে যাচ্ছে ফিফা। তবে মাঠের লড়াই শুরুর অনেক আগেই বিশ্বকাপকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্য নিয়ে। আর এবার সেই বিতর্কে যোগ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump।
বিশ্বকাপের টিকিটের দাম নিয়ে সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম New York Post–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ম্যাচের টিকিটের মূল্য প্রায় এক হাজার ডলারে পৌঁছেছে শুনে তিনি অবাক হয়েছেন। তার ভাষায়, “আমি এই সংখ্যাটা জানতাম না। অবশ্যই আমি সেখানে থাকতে চাইতাম, কিন্তু সত্যি বলতে এত দাম আমি নিজেও দিতাম না।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ বিশ্বকাপ সবসময়ই সাধারণ মানুষের উৎসব হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফুটবলপ্রেমীরা বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন প্রিয় দল ও তারকাদের মাঠে দেখার জন্য। কিন্তু এবার টিকিটের উচ্চমূল্য অনেক সমর্থকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, সাধারণ মানুষ যদি মাঠে বসে বিশ্বকাপ উপভোগ করতে না পারে, তাহলে সেটি অত্যন্ত হতাশাজনক হবে। তিনি উল্লেখ করেন, নিউইয়র্কের কুইন্স, ব্রুকলিনসহ সাধারণ কর্মজীবী মানুষেরাও যেন এই বৈশ্বিক আয়োজনের অংশ হতে পারে, সেটিই তিনি দেখতে চান। ট্রাম্প বলেন, “যেসব সাধারণ মানুষ আমাকে সমর্থন করে, তারা যদি মাঠে যেতে না পারে, তাহলে আমি হতাশ হব। আমি চাই বিশ্বকাপ সবার জন্য হোক।”
বিশ্বকাপের টিকিটের মূল্য নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে এবারের আসরে মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ায় বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রুপ পর্বের অনেক ম্যাচের টিকিটের দামই কয়েকশ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে নকআউট পর্ব ও ফাইনালের টিকিটের পুনর্বিক্রয় মূল্য আকাশচুম্বী পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশেষ করে বিশ্বকাপ ফাইনালের কিছু পুনর্বিক্রয় টিকিটের দাম প্রায় ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত উঠেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের মূল্য শুনে অনেক ফুটবলপ্রেমী বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ফুটবল কি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে?
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা FIFA অবশ্য টিকিটের উচ্চমূল্য নিয়ে সরাসরি উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। বরং ফিফা প্রেসিডেন্ট Gianni Infantino বিষয়টিকে অনেকটা স্বাভাবিক হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বড় ক্রীড়া ইভেন্টগুলোর টিকিট সাধারণত ব্যয়বহুল হয় এবং বিশ্বকাপের মতো বিশাল আয়োজনের ক্ষেত্রে চাহিদাও অত্যন্ত বেশি।
তবে ইনফান্তিনোর এই মন্তব্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। অনেক ফুটবল সমর্থক এবং বিশ্লেষক যুক্তি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত অন্যান্য জনপ্রিয় ক্রীড়া ইভেন্ট যেমন এনবিএ, এনএফএল কিংবা বেসবল ম্যাচের টিকিটও তুলনামূলকভাবে কম দামে পাওয়া যায়। ফলে বিশ্বকাপের টিকিটের এই অতিরিক্ত মূল্যকে অনেকেই অযৌক্তিক বলছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়; এটি বিশ্ব সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগের অন্যতম বড় মিলনমেলা। সেখানে সাধারণ সমর্থকদের অংশগ্রহণ কমে গেলে পুরো আয়োজনের আবহও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের উপস্থিতিই বিশ্বকাপকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
বিশ্বকাপ আয়োজনের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়িক দিকটিও এবার বড় আলোচনায় এসেছে। ক্রীড়া অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান বিশ্বকাপ শুধু ক্রীড়া ইভেন্ট নয়, বরং বহু বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক ব্যবসায়িক প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ, বিপণন এবং টিকিট বিক্রি—সবকিছু মিলিয়ে আয়োজক সংস্থা বিপুল অর্থ আয় করে থাকে। ফলে টিকিটের মূল্যও এখন বাণিজ্যিক চাহিদার ওপর নির্ভর করে বাড়ানো হচ্ছে।
অন্যদিকে সমর্থকদের একাংশ মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর পুনর্বিক্রয় বাজারও টিকিটের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে তুলছে। অনেক সময় স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা বট ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ টিকিট কিনে পরে চড়া দামে বিক্রি করা হয়। এতে প্রকৃত ফুটবল সমর্থকেরা শুরুতেই টিকিট সংগ্রহের সুযোগ হারান।
২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে উত্তর আমেরিকাজুড়ে ইতোমধ্যেই ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। নতুন স্টেডিয়াম সংস্কার, নিরাপত্তা পরিকল্পনা, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পর্যটন খাত সম্প্রসারণে কাজ করছে আয়োজক দেশগুলো। ফিফাও এবারের বিশ্বকাপকে ইতিহাসের সবচেয়ে আধুনিক ও বাণিজ্যিকভাবে সফল টুর্নামেন্টে পরিণত করতে চায়।
তবে আয়োজন যত বড় হচ্ছে, ততই বাড়ছে সাধারণ দর্শকদের প্রত্যাশা ও উদ্বেগ। বিশেষ করে টিকিটের মূল্য নিয়ে বর্তমান বিতর্ক দেখিয়ে দিচ্ছে, ফুটবলপ্রেমীদের বড় একটি অংশ মনে করছে বিশ্বকাপের মতো আয়োজন সবার জন্য সহজলভ্য থাকা উচিত।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য এই বিতর্ককে আরও বড় পরিসরে নিয়ে গেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার বক্তব্য বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একইসঙ্গে এটি ফিফার ওপরও কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারে, যাতে তারা সাধারণ দর্শকদের জন্য আরও সাশ্রয়ী টিকিট ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে।
সবমিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ মাঠে গড়ানোর আগেই টিকিটের মূল্য নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখন বৈশ্বিক ফুটবল অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয়। ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই মহোৎসব শেষ পর্যন্ত কতটা সাধারণ মানুষের নাগালে থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।