প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্যিক ও কৌশলগত চুক্তি নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি Mujahidul Islam Selim যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের “গোলামির চুক্তি” স্বাক্ষর না করার আহ্বান জানিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টক শোতে অংশ নিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। তার বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা তৈরি হয়েছে।
টক শোতে বক্তব্য দিতে গিয়ে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল দেশের সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষা করা। তিনি বলেন, “আমার গা শির শির করে ওঠে। আমরা পিন্ডির হাত থেকে স্বাধীন হয়েছি নতুন করে দিল্লি বা ওয়াশিংটনের গোলাম হওয়ার জন্য না।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত বিদেশি প্রভাব ও নির্ভরশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি যে বাণিজ্যিক চুক্তির আলোচনা সামনে এসেছে, সেটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতা ছাড়ার আগ মুহূর্তে বা জরুরি পরিস্থিতির আগে এমন চুক্তি কেন করতে হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। সেলিমের ভাষায়, “জনগণের প্রশ্ন—এটা কি তাহলে বিশেষ কোনো অ্যাসাইনমেন্ট ছিল, নাকি কোনো হিডেন এজেন্ডা ছিল?”
তার এই মন্তব্য দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিশেষ করে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে। একদিকে সরকার উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও বামপন্থী দলগুলোর একটি অংশ জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সামনে আনছে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তার বক্তব্যে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বানও জানান। তিনি বলেন, “আমি আবার নতুন করে সাবধান করে দিচ্ছি এবং জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছি, কিছুতেই আমেরিকার গোলামির চুক্তি আমরা স্বাক্ষর হতে দেব না। এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনে যা হয় আমরা করব।” তার এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশে বিদেশি শক্তির প্রভাব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সামরিক বা অর্থনৈতিক চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র মতবিরোধ দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন বা অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের প্রশ্নে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক একটি বাস্তবতা হলেও সেই সম্পর্ক কতটা ভারসাম্যপূর্ণ হবে, সেটিই মূল প্রশ্ন। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। তবে একইসঙ্গে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বিভিন্ন কারণে আলোচনায় এসেছে। বাণিজ্য, মানবাধিকার, শ্রমনীতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান—এসব বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নানা পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতি ও অবস্থান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, বাংলাদেশ “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়” নীতিতে বিশ্বাস করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে দাবি করা হয়েছে।
তবে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি শক্তির প্রভাব ও বহুজাতিক করপোরেট স্বার্থের বিষয়ে সমালোচনামুখর। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বা সামরিক চুক্তির ক্ষেত্রে জনগণের স্বার্থ ও দেশের স্বাধীন নীতিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সাম্প্রতিক বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তার সমর্থকেরা বলছেন, তিনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা মনে করছেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে “গোলামির চুক্তি” হিসেবে ব্যাখ্যা করা অতিরঞ্জিত হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে নির্বাচন, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের সময় বিদেশি সম্পর্কের বিষয়টি জনগণের কাছে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি কঠিন। আবার অন্য অংশের মানুষ জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশ একা বিচ্ছিন্নভাবে চলতে পারে না। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বড় কোনো চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হলে তা দীর্ঘমেয়াদে জনমত ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
সবমিলিয়ে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের বক্তব্য আবারও দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। তার এই অবস্থান ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।