থ্যালাসেমিয়া রোধে সচেতনতার তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬
  • ৩ বার
থ্যালাসেমিয়া রোধে সচেতনতার তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশ: ৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস উপলক্ষে দেশের জনগণের প্রতি সচেতনতার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, থ্যালাসেমিয়া একটি জটিল ও বংশগত রক্তরোগ, যা শুধু একজন ব্যক্তির শারীরিক অবস্থাকেই প্রভাবিত করে না, বরং একটি পরিবার এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করে। এ রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

শুক্রবার (৮ মে) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে দেওয়া এক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস উপলক্ষে দেওয়া ওই বার্তায় তিনি থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, গণমাধ্যম এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে আক্রান্ত রোগীদের পাশে দাঁড়াতে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

এবারের বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘আর আড়াল নয়: রোগ নির্ণয়হীনদের খুঁজে বের করি, অলক্ষ্যে থাকা রোগীদের সহায়তা করি’। স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির এই বৈশ্বিক প্রচারণার সঙ্গে বাংলাদেশও যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে। বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, রক্তদান কর্মসূচি এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম আয়োজন করেছে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, দেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ থ্যালাসেমিয়ার জিন-বাহক বলে ধারণা করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। কারণ পিতা-মাতা উভয়েই যদি থ্যালাসেমিয়ার জিন-বাহক হন, তাহলে তাদের সন্তানের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। সেই বাস্তবতায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ রাখতে এখন থেকেই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, সরকার বর্তমানে “প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম” নীতিকে সামনে রেখে স্বাস্থ্যখাতে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। থ্যালাসেমিয়ার মতো জটিল ও ব্যয়বহুল রোগ প্রতিরোধে আগাম সচেতনতা এবং পরীক্ষার ব্যবস্থা সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিশেষ করে বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা এবং জিনগত অবস্থা যাচাই করার বিষয়ে সমাজে সচেতনতা তৈরির ওপর জোর দেন তিনি।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুজন থ্যালাসেমিয়া জিন-বাহকের মধ্যে বিবাহ হলে তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। তাই এ বিষয়ে পরিবার পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তিনি মনে করেন, সামাজিক ট্যাবু ও অজ্ঞতার কারণে এখনও অনেক মানুষ এ রোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। ফলে সময়মতো পরীক্ষা না করানো এবং বিষয়টি গোপন রাখার প্রবণতা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থ্যালাসেমিয়া মূলত একটি বংশগত রক্তরোগ, যেখানে শরীরে পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় না। এতে আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত রক্ত গ্রহণ করতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে। চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক পরিবার অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপে পড়ে যায়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে রোগটি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব থাকায় অনেক রোগী দেরিতে শনাক্ত হন।

চিকিৎসকদের মতে, থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আগাম স্ক্রিনিং ও সচেতনতা। বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করলে জিন-বাহক শনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং সেক্ষেত্রে ঝুঁকি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। বিশ্বের অনেক দেশেই এ ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচি কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যার ফলে নতুন আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

প্রধানমন্ত্রী তার বার্তায় দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত আধুনিকায়নের বিষয়েও আলোকপাত করেন। তিনি জানান, সরকার নাগরিকদের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। এই কার্ড চালু হলে একজন নাগরিক তার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করতে পারবেন। একইসঙ্গে দেশের যেকোনো স্থানে চিকিৎসা নিলেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক দ্রুত রোগীর স্বাস্থ্য-তথ্য জানতে পারবেন।

সরকারের এই উদ্যোগ স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-হেলথ কার্ড চালু হলে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে। কারণ রোগীর পূর্ববর্তী রক্ত গ্রহণের ইতিহাস, চিকিৎসা পদ্ধতি ও অন্যান্য স্বাস্থ্য তথ্য দ্রুত পাওয়া গেলে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

এদিকে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল, বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠন সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় রক্তদান কর্মসূচি, ফ্রি স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে তাদের পরিবারগুলো রোগটি মোকাবিলায় নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।

স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, এখনও দেশের অনেক মানুষ থ্যালাসেমিয়াকে ছোঁয়াচে রোগ মনে করেন, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এই ধরনের সামাজিক ভুল ধারণা রোগীদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং অনেক পরিবার সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়। তাই রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বার্তা জনস্বাস্থ্য ইস্যুতে সরকারের অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় ভবিষ্যতে এ রোগ প্রতিরোধে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ থ্যালাসেমিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তথ্যভিত্তিক সচেতনতা এবং আগাম প্রস্তুতি।

বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই রোগের প্রভাব তুলনামূলক বেশি। বাংলাদেশেও ক্রমবর্ধমান জিন-বাহকের সংখ্যা বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তাই সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

প্রধানমন্ত্রী তার বার্তার শেষাংশে দেশের সব পেশাজীবী, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, গণমাধ্যম, অভিভাবক এবং সচেতন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান, যাতে সবাই মিলে জনগণের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করেন। একইসঙ্গে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস উপলক্ষে গৃহীত সব কর্মসূচির সফলতা কামনা করেন তিনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত