হরমুজ সংকটে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৪ শতাংশ বৃদ্ধি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১১ মে, ২০২৬
  • ৭ বার
তেলের দাম বিশ্ব বাজারে বেড়েছে।

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তার জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম একদিনেই ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বরং পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। কারণ, বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে।

সোমবার (১১ মে) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৪ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ দশমিক ৪৫ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে মার্কিন বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই তেলের দাম ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৮০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধির পর এবার নতুন করে বড় লাফে দাম বাড়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তাহীনতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া শান্তি প্রস্তাবকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে মন্তব্য করার পর বাজারে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ধারণা করা হচ্ছে, স্বল্প সময়ের মধ্যে সংকট নিরসনের সম্ভাবনা কমে গেছে।

বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের বড় একটি অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। এই সংকীর্ণ জলপথে চলাচল বিঘ্নিত হলে তা সরাসরি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। বর্তমানে বেশ কিছু তেলবাহী জাহাজ নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বিকল্প রুট ব্যবহার করছে, আবার কিছু জাহাজ ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ রেখেই চলাচল করছে বলে আন্তর্জাতিক শিপিং পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো জানিয়েছে। এতে বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের বাজার এখন পুরোপুরি রাজনৈতিক বক্তব্য ও সামরিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটন কিংবা তেহরান থেকে আসা প্রতিটি বিবৃতি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। ফলে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার কোনো নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। এই অবস্থায় তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য বেইজিং সফর ঘিরেও আন্তর্জাতিক বাজারে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ইরান সংকট এবং হরমুজ পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, চীন ইরানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদার হওয়ায় বেইজিং চাইলে কূটনৈতিকভাবে তেহরানের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি ও স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরুদ্ধারে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্বের বৃহত্তম তেল কোম্পানিগুলোর একটি সৌদি আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের জানিয়েছেন, গত দুই মাসে বিশ্ববাজার প্রায় ১ বিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ হারিয়েছে। তার মতে, বর্তমানে শুধু সরবরাহ সংকট নয়, বরং বাজারে আস্থার সংকটও তৈরি হয়েছে। অনেক দেশ আগাম মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করছে, যার কারণে বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হলেও বাজারকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরতে বেশ সময় লাগতে পারে।

তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। এর ফলে খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। অনেক দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে।

বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে সরকারের ব্যয়ও বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যদি এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলো আরও বড় চাপের মুখে পড়বে।

বিশ্ববাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অনেক বিনিয়োগকারী এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। কেউ কেউ নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন, আবার অনেকে জ্বালানি খাতের শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। তবে সামগ্রিকভাবে বাজারে অনিশ্চয়তা এতটাই বেশি যে স্বল্প সময়ের মধ্যে বড় ধরনের ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলো বলছে, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানো কঠিন হবে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এখন কেবল সামরিক ইস্যু নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এখন পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে কূটনৈতিক উদ্যোগের দিকে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা কম। আর যতদিন উত্তেজনা চলবে, ততদিন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা বজায় থাকবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত