তেলের দাম ঠেকাতে রিজার্ভ খুলছে যুক্তরাষ্ট্র

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
  • ৬ বার
তেলের দাম ঠেকাতে রিজার্ভ খুলছে যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশ: ১২ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব এখন সরাসরি পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। কয়েক সপ্তাহ ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ, সরবরাহ সংকট এবং সম্ভাব্য রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে বিশ্ব অর্থনীতি। এমন বাস্তবতায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছে, মার্কিন কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে ৫৩.৩ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল জ্বালানি কোম্পানিগুলোর কাছে ঋণ হিসেবে সরবরাহ করা হবে।

মার্কিন জ্বালানি বিভাগ বা ডিওই জানিয়েছে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বাজারে সরবরাহের ঘাটতি কমানো এবং আন্তর্জাতিক তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। বৈশ্বিক চুক্তির আওতায় নেওয়া এই পদক্ষেপকে বর্তমান সংকট মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের অন্যতম বড় জ্বালানি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। কারণ বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা এসপিআর মূলত জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত একটি বিশাল জ্বালানি মজুত। আন্তর্জাতিক যুদ্ধ, বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের সময় এই মজুত ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম বড় সরকারি তেল সংরক্ষণ কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হয়। টেক্সাস ও লুইজিয়ানার ভূগর্ভস্থ লবণ গুহায় সংরক্ষিত এই তেল যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবেও পরিচিত।

ডিওই সূত্রে জানা গেছে, গত মাসেও ৯টি বড় জ্বালানি কোম্পানিকে প্রায় ৯২.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই বরাদ্দের পুরোটা ব্যবহার করেনি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো। ExxonMobil, Trafigura এবং Marathon Petroleum-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মিলে বরাদ্দের মাত্র ৫৮ শতাংশ ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজার পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা, পরিবহন ব্যয় এবং চাহিদা নিয়ে সংশয়ের কারণেই কোম্পানিগুলো পুরো বরাদ্দ ব্যবহার করতে পারেনি।

তবে নতুন করে ৫৩.৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত প্রমাণ করছে যে, ওয়াশিংটন পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। মার্কিন প্রশাসনের ধারণা, যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল হলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রপ্তানি ব্যাহত হলে ইউরোপ, এশিয়া এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে সরাসরি চাপ তৈরি হবে।

এই পদক্ষেপ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে প্রায় সব খাতেই। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে, শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়ে এবং মুদ্রাস্ফীতি তীব্র হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে, কারণ তারা আমদানি-নির্ভর জ্বালানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সংকটের সমাধান নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং যুদ্ধ কতটা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায় তার ওপর। যদি সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে শুধু কৌশলগত রিজার্ভ ব্যবহার করে বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিয়ে উদ্বেগ ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ও উৎপাদন খাতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলোও বাড়তি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো দেশেও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি স্থানীয় বাজারেও প্রভাব ফেলে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগ মূলত বাজারে একটি বার্তা দেওয়ার কৌশলও বটে। ওয়াশিংটন দেখাতে চাইছে, বিশ্ববাজারে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট দেখা দিলে তারা হস্তক্ষেপ করতে প্রস্তুত। এতে বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কিছুটা আস্থা ফিরে আসতে পারে। অনেক সময় বাজারে আতঙ্ক ও জল্পনার কারণেও তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। তাই কৌশলগত রিজার্ভ থেকে তেল ছাড়ার ঘোষণা মনস্তাত্ত্বিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সমালোচকরাও কম নন। কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের স্থায়ী সমাধান ছাড়া শুধু রিজার্ভ ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আবার অনেকের মতে, অতিরিক্ত হারে রিজার্ভ ব্যবহার করলে ভবিষ্যতের জরুরি পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কারণ এসপিআর মূলত জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, নিয়মিত বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ইরানের ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক রাষ্ট্র। ফলে ইরানকে ঘিরে যেকোনো সংঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে। বর্তমানে বাজারের সবচেয়ে বড় ভয়ও সেখানেই।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎপর্যপূর্ণ এক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ওয়াশিংটন যে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছে, তারই অংশ এই তেল ঋণ কর্মসূচি। এখন দেখার বিষয়, এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বাজারে কতটা কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত