সিন্ডিকেটে বাড়ছে পণ্যমূল্য, অভিযোগ জামায়াতের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
  • ৬ বার
সিন্ডিকেটে বাড়ছে পণ্যমূল্য, অভিযোগ জামায়াতের

প্রকাশ: ১২ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বাজারব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে যখন সাধারণ মানুষ ক্রমেই চাপে পড়ছেন, ঠিক সেই সময়ে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির Shafiqur Rahman। তিনি অভিযোগ করেছেন, একটি সিন্ডিকেট চক্র কৃত্রিমভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যকেও বর্তমান সংকটের বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।

মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর Mirpur Shah Ali Wholesale Market পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির। বাজার ঘুরে বিভিন্ন পাইকার, খুচরা ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি বলেন, দেশের মানুষ বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে প্রতিদিনের বাজার করা সাধারণ পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ভাষায়, বাজারে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ নেই, বরং একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে পণ্যের সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণ করছে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যের মূল্য বাড়ানোর প্রবণতা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এটি আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগী এবং চাঁদাবাজ একসঙ্গে কাজ করে বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। এর ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, আবার ভোক্তাদেরও অতিরিক্ত দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। মাঝখানে লাভবান হচ্ছে একটি সীমিত গোষ্ঠী।

তিনি আরও বলেন, বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার পুরো চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে উঠছে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী ও সীমিত আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জামায়াত আমিরের বক্তব্যে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠে আসে। তিনি বলেন, শুধু প্রশাসনিক অভিযান চালালেই সমস্যার সমাধান হবে না, বরং বাজারব্যবস্থার ভেতরে যে অসাধু সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, সাধারণ মানুষের জন্য বাজারকে সহনীয় পর্যায়ে রাখা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজার পরিস্থিতি দেশের মানুষের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার এবং সরবরাহ চেইনের সমস্যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই অভিযোগ করে থাকে, এসব বৈশ্বিক কারণের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অসাধু চক্রও মূল্যবৃদ্ধিকে উসকে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে কৃষিপণ্য উৎপাদন পর্যায়ে দাম কম থাকলেও ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে অনেক সময় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এর পেছনে পরিবহন খরচ, সংরক্ষণ সংকট, মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য এবং বাজার তদারকির দুর্বলতাকে দায়ী করা হয়। অনেক সময় মৌসুমি পণ্যেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর অভিযোগ ওঠে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

বাজার পরিদর্শনের সময় জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে তারা মতবিনিময় করেন। বিভিন্ন দোকানে গিয়ে পণ্যের দাম সম্পর্কে খোঁজ নেন এবং সরবরাহ পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় বেশ কয়েকজন ক্রেতা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। কেউ কেউ বলেন, আয় বাড়ছে না, কিন্তু প্রতিনিয়ত বাড়ছে বাজার খরচ। ফলে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্রব্যমূল্যের বিষয়টি এখন দেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। সরকারবিরোধী দলগুলো সাধারণ মানুষের ভোগান্তির প্রসঙ্গ তুলে রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা নিয়মিত অভিযান ও তদারকি চালিয়ে যাচ্ছে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের স্বার্থে সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিরোধী দল এই ইস্যুতে সোচ্চার থাকবে। তিনি দাবি করেন, বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি প্রয়োজন। শুধু সাময়িক অভিযান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কার ছাড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

এদিকে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করতে হবে। কৃষক, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার মধ্যে ব্যবধান কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও বলছেন তারা। একই সঙ্গে অবৈধ মজুতদারি ও চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদও দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে ঈদ কিংবা বড় উৎসবের আগে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ সাধারণত বেড়ে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নিত্যপণ্যের পাশাপাশি সবজি, চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও মসলার বাজারেও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও বাজার পরিদর্শনও তাই নতুন করে জনমনে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে বাজারে মূল্য অস্থিরতা এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনারও কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ চাইছেন স্থিতিশীল বাজার, সহনীয় দাম এবং কার্যকর তদারকি। আর রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে দোষারোপ ও পাল্টা বক্তব্যের মধ্যেই মূল প্রশ্নটি রয়ে যাচ্ছে— সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরবে কবে?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত