প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে চলমান টিকাদান কর্মসূচির মধ্যেই টিকা গ্রহণের পরও কিছু শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। বিশেষ করে নবজাতক ও ছোট শিশুদের মধ্যে এ ধরনের সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় অনেক পরিবারই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, টিকা নেওয়ার পর আক্রান্ত হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি কম থাকে এবং এটি টিকার কার্যকারিতার সঙ্গে সরাসরি বিরোধপূর্ণ নয়।
দেশে বর্তমানে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে একটি জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করে এই কর্মসূচি চালু করা হয়েছে, যাতে দেশব্যাপী হাম সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। কর্মসূচি শুরুর পর থেকেই অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া দেখা যায়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু শিশুর টিকা নেওয়ার পরও জ্বর, র্যাশ এবং শারীরিক দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে ভর্তি একাধিক শিশুর মধ্যে এমন উপসর্গ দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবকরা। একজন অভিভাবক বলেন, টিকা দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই শিশুর শরীরে ছোট ছোট দানা দেখা দেয় এবং জ্বর শুরু হয়। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়। তিনি জানান, টিকা নেওয়ার পর এমন পরিস্থিতি হবে তা তারা আশা করেননি।
আরেক অভিভাবক বলেন, টিকা দেওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর শিশুর জ্বর শুরু হয় এবং পরে হাম ধরা পড়ে। তার মতে, টিকা নেওয়ার পরই এ ধরনের অসুস্থতা দেখা দেওয়ায় তারা কিছুটা বিভ্রান্ত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
তবে চিকিৎসকরা এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. আসিফ হায়দার বলেন, কোনো টিকা নেওয়ার পর শরীরে সম্পূর্ণ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠতে সাধারণত তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে। এই সময়ের মধ্যে কেউ ভাইরাসের সংস্পর্শে এলে সংক্রমিত হতে পারে। তাই টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
তিনি আরও বলেন, কোনো টিকাই শতভাগ সুরক্ষা দেয় না। তবে টিকা গ্রহণ করলে আক্রান্ত হলেও রোগের তীব্রতা অনেক কম থাকে এবং জটিলতা বা মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। অর্থাৎ টিকা শরীরকে একটি প্রতিরক্ষামূলক অবস্থায় নিয়ে যায়, যা গুরুতর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, হাম একসময় অনেক উন্নত দেশে নির্মূল ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও কিছু দেশে এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের হার কমে যাওয়া এবং কিছু অঞ্চলে প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এই পুনরুত্থান ঘটছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে চিকিৎসকরা মনে করছেন। যদিও দেশে টিকাদান কর্মসূচি নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তবুও পুষ্টিহীনতা, সচেতনতার অভাব এবং সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়ার কারণে মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি রয়ে গেছে।
চিকিৎসকরা জানান, উন্নত দেশগুলোতে হামজনিত মৃত্যুহার অনেক কম, কারণ সেখানে পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ অনেক বেশি। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসে, ফলে জটিলতা বেড়ে যায়।
ডা. আসিফ হায়দার বলেন, আমাদের দেশে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি একটি বড় সমস্যা। অপুষ্ট শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম থাকে, যার কারণে তারা সহজেই জটিল সংক্রমণের শিকার হয়। তাই শুধু টিকা নয়, পুষ্টিকর খাদ্য ও নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, টিকা নেওয়ার পর শিশুদের মধ্যে সামান্য জ্বর বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে, যা সাধারণত স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তবে দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আসন্ন ঈদ ও ছুটির সময় শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বানও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তারা বলেন, এই সময়ে শিশুদের অপ্রয়োজনীয় ভিড় বা অসুস্থ ব্যক্তিদের সংস্পর্শে না আনা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেসব এলাকায় হাম সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে, সেখানে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকাদান কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া হাম নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। পাশাপাশি প্রতিটি শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সুবিধা সহজলভ্য করা জরুরি।
সব মিলিয়ে চিকিৎসকরা আশ্বস্ত করেছেন যে, টিকা নেওয়ার পর হাম হওয়া মানেই টিকা অকার্যকর নয়। বরং এটি রোগের ভয়াবহতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং সঠিক তথ্য জানা অত্যন্ত প্রয়োজন, যাতে অযথা আতঙ্ক তৈরি না হয়।