প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, গতিশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে আগামী জুলাই মাস থেকে সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে লেনদেন বাধ্যতামূলক করা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
মঙ্গলবার (১২ মে) রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির উদ্বোধনী তহবিল ঘোষণা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ ঘোষণা দেন। অনুষ্ঠানে দেশের ব্যাংকিং খাত, উদ্যোক্তা মহল, নীতিনির্ধারক এবং বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
গভর্নর বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে আধুনিক ও কার্যকর করতে হলে নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে। এর পরিবর্তে সহজ, দ্রুত এবং নিরাপদ ইলেকট্রনিক লেনদেন ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি। তিনি জানান, জুলাই থেকে দোকানপাট, শপিং মল, রেস্তোরাঁ, সেবা প্রতিষ্ঠানসহ সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন বাধ্যতামূলক করা হবে।
তিনি আরও বলেন, এই সিদ্ধান্ত কেবল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য নয়, বরং অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি বড় পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে লেনদেন আরও সহজ হবে, হিসাব ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আসবে এবং কর ব্যবস্থাও আরও কার্যকর হবে।
গভর্নর উল্লেখ করেন, নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমলে অর্থপাচার ও অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন কমে আসবে। এতে দেশের আর্থিক খাতে আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব সংগ্রহ আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি বলেন, সরকার দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর জন্য কাজ করছে। মোবাইল অর্থ লেনদেন ব্যবস্থা, অনলাইন ব্যাংকিং এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী এখন আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তবে এখনো অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীল, যা আধুনিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় বাধা।
নতুন এই উদ্যোগ সেই বাধা দূর করতে সহায়তা করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, কিউআর কোড ব্যবহারের মাধ্যমে একজন ক্রেতা খুব সহজেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে দোকানে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন, এতে সময় কম লাগবে এবং নিরাপত্তাও বাড়বে।
গভর্নর বলেন, “আমরা এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই যেখানে প্রতিটি লেনদেন হবে স্বচ্ছ, দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে বড় প্রতিষ্ঠান সবাই একই প্রযুক্তির আওতায় আসবে।”
অনুষ্ঠানে তিনি আরও জানান, এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কার্যক্রমও চালু করা হবে, যাতে তারা সহজেই নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন ব্যবস্থা যত বিস্তৃত হবে, দেশের অর্থনীতি তত বেশি শক্তিশালী হবে। বিশেষ করে রাজস্ব আদায়, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে তারা বলেন, সফল বাস্তবায়নের জন্য ব্যবসায়ী পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ছোট ব্যবসায়ী এখনও নগদ অর্থের ওপর নির্ভর করেন। তাদের জন্য সহজ প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং সহায়তা নিশ্চিত না করলে এই উদ্যোগ পুরোপুরি সফল হবে না।
গভর্নর বলেন, সরকার এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় ধাপে ধাপে কাজ করবে। প্রথম পর্যায়ে বড় শহরগুলোতে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে এবং পরবর্তীতে ধীরে ধীরে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। তাই ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক খাতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থা চালু হলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরও দ্রুত হবে এবং গ্রাহক সেবার মান বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকিও কমে যাবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ নগদবিহীন অর্থনীতির দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। এটি শুধু আর্থিক খাত নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে।
গভর্নর তাঁর বক্তব্যের শেষাংশে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে নিরাপদ ও শক্তিশালী করতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন এই ব্যবস্থা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও গতিশীল, স্বচ্ছ এবং আধুনিক রূপ লাভ করবে।