দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে বাড়ছে জনদুর্ভোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
  • ২৬ বার
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে বাড়ছে জনদুর্ভোগ

প্রকাশ: ১৩ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় আলোচ্য বিষয় এখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। বাজারে প্রতিদিন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে, অথচ সেই তুলনায় মানুষের আয় বাড়ছে না। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনে তৈরি হয়েছে তীব্র চাপ। সংসারের খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, ধারদেনা করতে হচ্ছে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় খরচও কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এমন বাস্তবতায় আগামী জাতীয় বাজেটকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা এখন একটাই— মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।

রাজধানীর রিকশা মিস্ত্রি ইসমাইলের জীবনচিত্র যেন দেশের লাখো নিম্নআয়ের মানুষের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করে তার আয় গড়ে ৭০০ টাকার মতো। সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে এই আয়েই তাকে চালাতে হয় সংসার। কয়েক বছর আগেও যে টাকায় মাসের বাজার মোটামুটি সামলে নেয়া যেত, এখন সেই টাকায় সপ্তাহও পার করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে গ্যাস-বিদ্যুৎ— সবকিছুর দাম বেড়েছে। সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও বাসাভাড়ার খরচও বেড়েছে কয়েক গুণ। ফলে মাস শেষে হাতে কিছুই থাকছে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের জুলাইয়ে যে পণ্য কিনতে ১০০ টাকা ব্যয় করতে হতো, ২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ সেই একই পণ্যের জন্য খরচ করতে হচ্ছে ১৫৫ টাকা ৮২ পয়সা। অর্থাৎ চার বছর নয় মাসে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। একই সময়ে মানুষের আয় বা মজুরি বেড়েছে তুলনামূলক কম। ২০২১ সালে কারও আয় যদি ১০০ টাকা হয়ে থাকে, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৪ টাকা ৭১ পয়সায়। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে আয়ের চেয়ে বেশি। এই ব্যবধানই সাধারণ মানুষের জীবনকে করে তুলেছে কঠিন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চাপ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে একটি পরিবার মাস শেষে কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারতো, এখন সেখানে অনেক পরিবার ধার করে চলতে বাধ্য হচ্ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই নিজেদের জীবনযাত্রার মান কমিয়ে ফেলেছেন। কেউ কম দামে খাবার কিনছেন, কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ সন্তানদের কোচিং বা অতিরিক্ত শিক্ষার খরচ কমিয়ে দিচ্ছেন।

সরকারও বিষয়টি উপলব্ধি করছে বলে আভাস মিলেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সূত্রে। আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের আলোচনা চলছে। যদিও বাস্তবতা বলছে, ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর থেকে টানা ৪৫ মাসেও মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের নিচে নামেনি। ফলে কেবল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না, তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়াই বর্তমান মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, ডলারের চাপ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধি শিল্প ও ব্যবসা খাতকে চাপে ফেলেছে। ফলে উৎপাদিত পণ্যের দামও বেড়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে সহায়তা না করলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ মনে করেন, বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ায় পণ্যের দামের ওপর চাপ বাড়ছে। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতকে যথাযথ সহায়তা না দিলে উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক হবে না। ফলে মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে আসবে না। তার মতে, শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে ঋণ এবং জ্বালানি খাতে স্থিতিশীল নীতি জরুরি।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু ইউসুফের মতে, মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করতে হবে। বাজারে কারসাজি ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদন খাতে প্রণোদনা দিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে পারলে মূল্যস্ফীতির চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।

বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, দেশে কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির গতি কমে গেলে মূল্যস্ফীতির প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ মানুষের হাতে আয় না থাকলে বাজারে চাহিদাও কমে যায়। এতে ব্যবসা ও শিল্প খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই মূল্যস্ফীতি কমানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান ধরে রাখাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

আগামী বাজেটে তাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তারা চান নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানো হোক, বাজার তদারকি বাড়ানো হোক এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হোক। বিশেষ করে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও শিশুখাদ্যের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের দামে স্থিতিশীলতা আনতে কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান মানুষ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটে শুধু বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বাস্তব সংকটকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে তা শুধু অর্থনীতিকেই নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে গেলে হতাশা বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

এমন পরিস্থিতিতে আগামী বাজেটকে ঘিরে সাধারণ মানুষের একটাই প্রশ্ন— কাগজে-কলমে ঘোষণার বাইরে বাস্তবে কি কমবে বাজারদর? ইসমাইলের মতো নিম্নআয়ের মানুষ কি আবারও মাস শেষে কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারবেন? নাকি মূল্যস্ফীতির চাপ আরও দীর্ঘ হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই এখন খুঁজছে দেশের মানুষ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত