সাবেক মন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
  • ৩ বার
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত প্রবীণ রাজনীতিক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন আর নেই। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক এই মন্ত্রী বুধবার সকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনসহ চট্টগ্রামের মীরসরাই এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন একজন সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকার কারণেও আলাদাভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, বুধবার সকাল ১০টার দিকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে তিনি মারা যান। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।

১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি ছিলেন দীর্ঘ সময়ের পরিচিত এক মুখ।

১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার সংসদীয় রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক উত্থান-পতন পেরিয়ে বহুবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি মীরসরাইয়ের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। টানা কয়েক দশক ধরে একই অঞ্চলের মানুষের আস্থা অর্জন করায় স্থানীয় রাজনীতিতে তার প্রভাব ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।

রাজনীতির পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল তার। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থানের কারণে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তিনি বিশেষ গুরুত্ব পান। রাজনৈতিক সহকর্মীদের অনেকে তাকে একজন নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি দুই দফায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও সামলেছেন। তার দায়িত্ব পালনকালেই বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি ভবন নির্মাণ এবং আবাসন খাতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। সমর্থকদের মতে, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পর দলটির অনেক নেতার মতো তিনিও বিতর্ক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। তারপরও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, সংসদীয় অভিজ্ঞতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার কারণে দেশের রাজনীতিতে তার নাম আলাদাভাবে উচ্চারিত হয়।

রাজনীতির বাইরে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডেও সম্পৃক্ত ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ১৯৬৪ সালে কক্সবাজারে তার বাবার প্রতিষ্ঠিত হোটেল সায়মনকে সম্প্রসারণের মাধ্যমে পর্যটন খাতে ব্যবসার পরিধি বাড়ান তিনি। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক মানের চার তারকা হোটেল ‘পেনিনসুলা চিটাগাং’-এর চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ব্যবসা ও পর্যটন খাতে তার এই সম্পৃক্ততা তাকে একজন উদ্যোক্তা হিসেবেও পরিচিতি এনে দেয়।

চট্টগ্রামের মীরসরাই অঞ্চলে শিক্ষা, যোগাযোগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নেও তার অবদান রয়েছে বলে স্থানীয়দের অনেকে মনে করেন। বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। যদিও রাজনৈতিক বিরোধীরা তার কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা করেছেন, তবুও এলাকায় তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিন ধরে বজায় ছিল।

তার মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে শোক প্রকাশ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা তাকে স্মরণ করে বলেছেন, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেসব নেতা দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিলেন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তাদের অন্যতম। সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, দলীয় উত্থান-পতন এবং নির্বাচনভিত্তিক রাজনীতির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সাক্ষী ছিলেন তিনি। ফলে তার মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষতি নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি পরিচিত অধ্যায়ের অবসান।

তার পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, জানাজা ও দাফনের বিষয়ে শিগগিরই বিস্তারিত জানানো হবে। শেষবারের মতো তাকে দেখতে রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং এলাকার সাধারণ মানুষ হাসপাতালে ভিড় করছেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে প্রশংসা ও সমালোচনা—দুইয়ের মধ্য দিয়েই পথ চলেছেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিক ও সংগঠক হিসেবে দেশের ইতিহাসে তার নাম থেকে যাবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত