প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি আবারও অস্থিরতার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এবার সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সরাসরি লক্ষ্য করে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইরান। তেহরানের সাম্প্রতিক বক্তব্য, সামরিক হুঁশিয়ারি এবং কূটনৈতিক ভাষার পরিবর্তন বিশ্লেষকদের নজর কাড়ছে। বিশেষ করে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক ও রাজনৈতিক মহল থেকে বারবার আমিরাতকে ‘শত্রু ঘাঁটি’ হিসেবে উল্লেখ করার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের বিভিন্ন সরকারি ও সামরিক সূত্র থেকে এমন একাধিক মন্তব্য এসেছে, যা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, তেহরান এখন আমিরাতকে শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে দেখছে না; বরং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও বিবেচনা করছে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের সদস্য আলি খেজরিয়ান সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, আমিরাতের সঙ্গে ‘প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক’ আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। তার ভাষায়, দেশটি এখন কার্যত একটি ‘শত্রু ঘাঁটি’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই বক্তব্যের পরই মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ও আমিরাতের সম্পর্ক ছিল একইসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল। রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আমিরাতকে নিয়ে ইরানের ক্ষোভের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে আবুধাবির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। বিশেষ করে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পর থেকে আমিরাতের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তেহরান মনে করছে, এই সহযোগিতা সরাসরি ইরানের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি সম্প্রতি এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, আমিরাত নিজেদের ভূখণ্ডকে ‘আমেরিকান ও জায়নবাদীদের আস্তানা’তে পরিণত করেছে। তাদের দাবি, ইসরাইলের উন্নত রাডার ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং সামরিক উপস্থিতি এখন আমিরাতে দৃশ্যমান। ইরানের দৃষ্টিতে এটি শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, বরং সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আল-ধাফরা বিমানঘাঁটি নিয়েও তেহরানের উদ্বেগ অনেক পুরোনো। এই ঘাঁটিতে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া উন্নত রাডার ও নজরদারি প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করা হয়। ইরান বিশ্বাস করে, তাদের সামরিক কার্যক্রম এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর নজরদারিতে এই ঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক উত্তেজনাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হয়। ইরান বহুদিন ধরেই দাবি করে আসছে, হরমুজ প্রণালির কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ তাদের নিরাপত্তার অংশ। আর আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর এই অঞ্চলের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যেটিকে ঘিরে ইরানের সামরিক উদ্বেগ রয়েছে।
সম্প্রতি ফুজাইরাহ বন্দরে হামলার ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যদিও ওই হামলার দায় অস্বীকার করেছে তেহরান, তারপরও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্দেহের তীর ইরানের দিকেই যায়। পরে আইআরজিসি দাবি করে, ওই অঞ্চল ইরানের সামুদ্রিক প্রভাব বলয়ের মধ্যে পড়ে এবং প্রয়োজনে সেখানে তারা ‘নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা’ নিতে সক্ষম।
অন্যদিকে আমিরাতও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। আবুধাবি জানিয়েছে, তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পূর্ণ সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। কোনো দেশ তাদের নিরাপত্তা নীতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে তারা বেশ কিছু অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপও নিয়েছে। বিভিন্ন সূত্র জানায়, বহু বছর ধরে বসবাসরত অনেক ইরানির ভিসা বাতিল করা হয়েছে এবং ইরানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতির অর্থনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে আমিরাত ছিল ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তেহরান আমিরাতের বন্দর ব্যবহার করে বিভিন্ন পণ্য আমদানি করত। এখন সেই পথ সীমিত হয়ে যাওয়ায় বিকল্প বাণিজ্য রুট খুঁজতে হচ্ছে ইরানকে। পাকিস্তান, ইরাক ও তুরস্ক হয়ে স্থলপথে বাণিজ্য সম্প্রসারণের চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই উত্তেজনার পেছনে শুধু বর্তমান সংঘাত নয়, বরং দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বও রয়েছে। গ্রেটার তুনব, লেসার তুনব এবং আবু মুসা দ্বীপ নিয়ে ইরান ও আমিরাতের বিরোধ বহু পুরোনো। ১৯৭১ সাল থেকে দ্বীপগুলো ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আমিরাত সেগুলোর ওপর নিজেদের দাবি ছাড়েনি। হরমুজ প্রণালির কৌশলগত অবস্থানের কারণে এই দ্বীপগুলো সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধ চলাকালে আমিরাত সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নিয়েছে কিনা—এ প্রশ্নও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কিছু আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে হামলার ক্ষেত্রে আমিরাতের সহযোগিতা ছিল। যদিও আবুধাবি এসব অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় ইরান ও আমিরাতের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা খুব বেশি না হলেও উত্তেজনা আরও বাড়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ এই দ্বন্দ্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্য।
এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যেকোনো সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ইতোমধ্যে তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ সেই বাস্তবতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, তা নির্ভর করবে কূটনৈতিক আলোচনার গতি, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটের ভবিষ্যৎ কৌশল এবং ইরানের আঞ্চলিক অবস্থানের ওপর। তবে আপাতত স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক এক নতুন ও অনিশ্চিত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।