নাটোরে র‌্যাবের ওপর হামলা, আহত ৫ সদস্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
  • ৫৪ বার
নাটোরে র‌্যাবের ওপর হামলা, আহত ৫ সদস্য

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নাটোরের লালপুর উপজেলায় মাদককারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) পাঁচ সদস্য। মঙ্গলবার রাতের এই ঘটনায় পুরো এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হঠাৎ করেই নবীনগর কবরস্থান এলাকায় চিৎকার-চেঁচামেচি ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। পরে জানা যায়, মাদক কারবারিদের অবস্থান শনাক্ত করতে যাওয়া র‌্যাব সদস্যদের ওপর সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালানো হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার (১২ মে) রাত প্রায় ৯টার দিকে উপজেলার নবীনগর কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায়। আহত র‌্যাব সদস্যরা হলেন আশিকুর রহমান, মিনহাজুল ইসলাম, আল আমিন, রিয়াজুল করিম ও শাহীন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হলেও গুরুতর আহত শাহীনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারিদের সক্রিয় উপস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় অপরিচিত ব্যক্তিদের যাতায়াত এবং গোপনে মাদক লেনদেনের অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে মুখে ছিল। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই সাদা পোশাকে র‌্যাব সদস্যরা সেখানে অভিযান পরিচালনা করতে যান বলে জানা গেছে।

লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এএসআই পারভেজ মুন্সির নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি দল সাদা পোশাকে এলাকায় যায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মাদক কারবারিদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা। কিন্তু ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরই পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। সেখানে অবস্থান করা কয়েকজন ব্যক্তি র‌্যাব সদস্যদের ঘিরে ধরে তাদের পরিচয় জানতে চায়। এক পর্যায়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে হামলাকারীরা র‌্যাব সদস্যদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের চাবি ছিনিয়ে নেয় এবং তাদের ওপর চড়াও হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে তর্কাতর্কি শুরু হলেও পরে সেটি দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়। হামলাকারীরা র‌্যাব সদস্যদের ধাক্কাধাক্কি করে এবং মারধর শুরু করে। এতে কয়েকজন সদস্য মাটিতে পড়ে যান। চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা দূরে সরে যায়। পরে খবর পেয়ে লালপুর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে কয়েকজন হামলাকারী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।

ঘটনার পর পুরো এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও ঘটনাটি তদন্ত করছেন। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সোহাগ নামে এক ব্যক্তিকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে বলছেন, এলাকায় মাদক ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা বাড়ে। অনেকেই ভয় বা সামাজিক চাপে প্রকাশ্যে কিছু বলতে চান না। তবে সাম্প্রতিক এই হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যদি হামলার শিকার হন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায়ই প্রতিরোধের মুখে পড়ছে। কারণ মাদক কারবারিরা অনেক ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ চক্র হিসেবে কাজ করে এবং স্থানীয় পর্যায়ে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক থাকে। ফলে অভিযানে গেলে সংঘর্ষ বা হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, এর সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।

চিকিৎসাধীন র‌্যাব সদস্যদের সহকর্মীরা জানিয়েছেন, আহতদের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল। তবে হামলার ঘটনায় বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা বলছেন, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে প্রায়ই জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়। তারপরও দায়িত্ব পালনে তারা পিছিয়ে যান না।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে মাদককারবারিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান আরও পরিকল্পিত ও নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন, যাতে এমন হামলার ঘটনা এড়ানো যায়।

এদিকে স্থানীয় প্রশাসন বলছে, হামলায় জড়িতদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। যারা সরাসরি হামলায় অংশ নিয়েছে এবং যারা পেছন থেকে সহযোগিতা করেছে, তাদের সবার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতোমধ্যে এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং পলাতকদের শনাক্তে অভিযান চলছে।

নাটোরের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, মাদকবিরোধী লড়াই কতটা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে সমাজে মাদকের বিস্তার, অন্যদিকে তা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযান— এই দ্বন্দ্বের মাঝখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু গ্রেপ্তার বা অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদক ব্যবসার পেছনে থাকা অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলোও খতিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত নজরদারি, স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় এমন সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা আরও বাড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত