প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করতে বড় ধরনের সহায়তা দিয়েছে চীনের ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান Sinovac Biotech। প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী সংস্থা Sinovac Foundation বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে ৩ লাখ ৮০ হাজার ডোজ পোলিও ভ্যাকসিন অনুদান হিসেবে প্রদান করেছে।
বুধবার (১৩ মে) রাজধানীর সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ভ্যাকসিন হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী Sardar Md. Sakhawat Hossain।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই অনুদানকৃত ভ্যাকসিনের নাম Poliomyelitis Vaccine (Vero Cell, Inactivated Sabin strains) বা sIPV। মোট ৩ লাখ ৮০ হাজার ডোজ ভ্যাকসিন ৭৬ হাজার ভায়ালে সংরক্ষিত রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত (WHO Pre-Qualified) এই ভ্যাকসিন বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) আরও গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বের অন্যতম সফল কর্মসূচি হিসেবে স্বীকৃত। তবে এই সফলতা ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সিনোভ্যাকের এই অনুদান দেশের শিশুদের পোলিও প্রতিরোধে চলমান প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করবে।
তিনি আরও বলেন, পোলিও নির্মূলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সফল অবস্থানে থাকলেও সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নজরদারি ও টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত রাখা জরুরি। এই ধরনের সহযোগিতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রোগমুক্ত রাখতে সহায়ক হবে।
অনুষ্ঠানে চীনা দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং সিনোভ্যাক বায়োটেকের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং টিকাদান কর্মসূচিকে টেকসই করতে ভবিষ্যতেও বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোলিও একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ, যা শিশুদের স্থায়ী পক্ষাঘাত এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশ্বব্যাপী টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে এই রোগ প্রায় নির্মূলের পর্যায়ে এসেছে। তবে কিছু অঞ্চলে ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে। তাই নিয়মিত টিকাদান এবং নজরদারি বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের জন্য বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী টিকা প্রদান করে আসছে। এর ফলে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং বহু রোগ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এই প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়মিতভাবে ভূমিকা রাখছে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা নতুন নয়। বিগত বছরগুলোতেও মহামারি ও জনস্বাস্থ্য সংকটে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম, ভ্যাকসিন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে চীন। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও ভ্যাকসিন সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের অনুদান শুধু স্বল্পমেয়াদী সহায়তা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে। তবে একই সঙ্গে তারা মনে করিয়ে দেন, দেশের নিজস্ব ভ্যাকসিন উৎপাদন ও গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে আরও বলা হয়, এই পোলিও ভ্যাকসিন দেশের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শিশুদের টিকাদান কার্যক্রমে ব্যবহার করা হবে। বিশেষ করে দূরবর্তী ও দুর্গম অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভ্যাকসিনগুলো যথাযথ শীতল শৃঙ্খল (cold chain) ব্যবস্থার মাধ্যমে সংরক্ষণ ও বিতরণ করা হবে যাতে এর কার্যকারিতা অক্ষুণ্ণ থাকে। ইপিআই কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিশুদের মধ্যে এই টিকা প্রদান করা হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই পোলিও সম্পূর্ণ নির্মূলের লক্ষ্যে কাজ করছে। বাংলাদেশ সেই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করে, যতক্ষণ না পুরো অঞ্চল সম্পূর্ণভাবে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সতর্কতা অব্যাহত রাখতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে সিনোভ্যাকের অনুদানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের সহযোগিতা দেশের টিকাদান কর্মসূচিকে শুধু সমৃদ্ধই করে না, বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আস্থা আরও বাড়ায়।
সব মিলিয়ে, চীনের এই ভ্যাকসিন অনুদান বাংলাদেশের শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য এখন এই সহায়তাকে কাজে লাগিয়ে টিকাদান কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করা।