সুপ্রিম কোর্ট বার ভোটে উৎসবমুখর আইনাঙ্গন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
  • ৩৮ বার
সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে

প্রকাশ: ১৩ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের আইনাঙ্গনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ২০২৬-২০২৭ মেয়াদের নির্বাচনকে ঘিরে রাজধানীর আদালতপাড়ায় সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। বুধবার সকাল থেকে শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী এই নির্বাচনের প্রথম দিনের ভোটগ্রহণে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুল সংখ্যক আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের আইনজীবী সমাজে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আগ্রহ ও আলোচনা চলে আসছে। কারণ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতৃত্ব শুধু পেশাগত ক্ষেত্রেই নয়, দেশের সামগ্রিক আইন ও বিচার ব্যবস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

বুধবার সকাল ১০টায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত এক ঘণ্টার বিরতি ছাড়া বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। নির্বাচন ঘিরে আদালত এলাকায় ছিল বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি সমিতির নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকরাও ভোটারদের সার্বিক সহযোগিতা করেন। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি আগেই সম্পন্ন করা হয়েছিল।

এবারের নির্বাচনে সভাপতি, সম্পাদকসহ কার্যনির্বাহী কমিটির মোট ১৪টি পদে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ৪০ জন প্রার্থী। ভোটার রয়েছেন ১১ হাজার ৯৭ জন আইনজীবী। সংখ্যার দিক থেকে এটি দেশের অন্যতম বড় পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে রাজনৈতিক ও পেশাগত উভয় ক্ষেত্রেই এই নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেল, জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত সবুজ প্যানেল এবং এনসিপি সমর্থিত লাল-সবুজ প্যানেলের মধ্যে। প্রতিটি প্যানেলই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে। আদালতপাড়াজুড়ে ব্যানার, পোস্টার, প্রার্থীদের গণসংযোগ এবং আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় ছিল চোখে পড়ার মতো।

বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেল থেকে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি জাতীয় রাজনীতিতেও পরিচিত মুখ এবং সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোহাম্মদ আলী। প্যানেলটির নেতারা নির্বাচনে বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তাদের দাবি, আইনজীবীদের অধিকার রক্ষা, পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং আদালতের স্বাধীনতা রক্ষায় তারা অতীতে ভূমিকা রেখেছেন এবং ভবিষ্যতেও সেই ধারা অব্যাহত রাখবেন।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত সবুজ প্যানেল থেকেও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। সভাপতি পদে আবদুল বাতেন এবং সম্পাদক পদে এ কে এম রেজাউল করিম খন্দকার নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। প্যানেলটির নেতারা বলছেন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিকে আরও কার্যকর ও সক্রিয় সংগঠনে পরিণত করতে তারা কাজ করতে চান। বিশেষ করে তরুণ আইনজীবীদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধা এবং কল্যাণমূলক কার্যক্রম বৃদ্ধির বিষয়টিকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন।

এবারের নির্বাচনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে এনসিপি সমর্থিত লাল-সবুজ প্যানেল। যদিও এই প্যানেল সভাপতি পদে কোনো প্রার্থী দেয়নি, তবে সম্পাদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের প্রার্থীরা অংশ নিয়েছেন। সম্পাদক পদে আজমল হোসেন বাচ্চু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্বকারী এই প্যানেলের অংশগ্রহণ আইনজীবী রাজনীতিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

এছাড়া প্যানেলের বাইরে থেকেও কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। সভাপতি পদে ইউনুছ আলী আকন্দ এবং সম্পাদক পদে ফরহাদ উদ্দিন ভুইয়া, মো. আবু ইয়াহিয়া দুলাল, মো. ওমর ফারুক ও মোহাম্মদ আশরাফ উজ-জামান খান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সদস্য পদেও রয়েছেন কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। তারা দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে আইনজীবীদের স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে ভোটারদের সমর্থন চাইছেন।

নির্বাচনকে ঘিরে আইনজীবীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেলেও অনেকেই মনে করছেন, এই নির্বাচন শুধু পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্ব নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও এখানে প্রতিফলন ঘটে। অতীতেও সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করেছে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও এই নির্বাচনের দিকে নিবিড় নজর রাখছেন।

ভোটকেন্দ্রে আসা অনেক আইনজীবী জানান, তারা এমন নেতৃত্ব চান যারা আদালতের মর্যাদা রক্ষা করবে এবং আইনজীবীদের পেশাগত সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। নবীন আইনজীবীদের মধ্যে কর্মসংস্থান, চেম্বার সংকট, আর্থিক নিরাপত্তা এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে সিনিয়র আইনজীবীরাও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

নির্বাচন উপলক্ষে আদালতপাড়ায় ছিল উৎসবের আবহ। বিভিন্ন প্রার্থীর সমর্থকরা ব্যাজ, ফেস্টুন ও প্রচারপত্র নিয়ে ভোটারদের স্বাগত জানান। কোথাও কোথাও স্লোগান এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের দৃশ্যও দেখা যায়। তবে সার্বিক পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির এবারের নির্বাচন পরিচালনার জন্য হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে নির্বাচন উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তারা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছেন। ভোট গণনা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করা হবে।

আইনজীবী মহলের অনেকে মনে করছেন, বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক ও বিচারিক বাস্তবতায় এবারের নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার, সাংবিধানিক প্রশ্ন এবং আদালতের স্বাধীনতা নিয়ে যে আলোচনা সমাজে বিদ্যমান, তার প্রতিফলনও এই নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে। ফলে কে বিজয়ী হবে, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়, সেটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুই দিনব্যাপী এই নির্বাচনের দ্বিতীয় দিনের ভোটগ্রহণ শেষে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হবে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোটার উপস্থিতি সন্তোষজনক এবং আইনজীবীদের মধ্যে উৎসাহও চোখে পড়ার মতো। আদালতপাড়ার রাজনৈতিক ও পেশাজীবী মহলে এখন একটাই আলোচনা—কে আসছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নতুন নেতৃত্বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত