প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করা হাম সংক্রমণ এবং শত শত শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় অবশেষে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিল সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, হামের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি অনেকটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো হলেও এর পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে তদন্ত করা হবে এবং প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, সরকার ইতোমধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যাপক টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং বাকি শিশুদেরও দ্রুত টিকার আওতায় আনা হবে।
বুধবার সকালে রাজধানীর সচিবালয়ে চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে পোলিও ভ্যাকসিন গ্রহণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, টিকাদান কর্মসূচির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান এবং মহামারি মোকাবিলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে যে হাম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি রোগ হঠাৎ করে এত ভয়াবহভাবে ফিরে আসবে, তা অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে বেশিরভাগ জেলায় জরুরি টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে এবং যেসব শিশু এখনো টিকার বাইরে রয়েছে, তাদেরও দ্রুত আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার শুধু হাম প্রতিরোধেই নয়, শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নিচ্ছে। আগামী জুন মাসের মধ্যেই দেশব্যাপী শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু হবে। এতে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে এবং অপুষ্টিজনিত ঝুঁকিও কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে কারও গাফিলতি, অবহেলা বা পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদিও তিনি সরাসরি কারও নাম উল্লেখ করেননি, তবে তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে স্বাস্থ্যখাতের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং টিকাদান ব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে সরকার এখন চাপের মুখে রয়েছে।
অনুষ্ঠানে সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ সরকারকে ৩ লাখ ৮০ হাজার ডোজ পোলিও ভ্যাকসিন অনুদান দেয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকলেও দেশের অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আবারও দেখা দিতে পারে।
দেশজুড়ে বর্তমানে হাম পরিস্থিতি যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ইতোমধ্যে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন নতুন নতুন আক্রান্ত শিশু ভর্তি হচ্ছে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট, চিকিৎসক সংকট এবং ওষুধের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
রাজধানীর কয়েকটি শিশু হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, হাম আক্রান্ত শিশুদের কান্না আর উদ্বিগ্ন স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। কোনো মা তার জ্বরাক্রান্ত শিশুকে কোলে নিয়ে চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষা করছেন, আবার কেউ সদ্য সন্তান হারিয়ে নির্বাক বসে আছেন হাসপাতালের করিডরে। চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক শিশু গুরুতর নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা এবং অপুষ্টিজনিত জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছে, যার ফলে মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকা না পাওয়া এবং কিছু এলাকায় টিকাদান কার্যক্রমের ঘাটতিই বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। যদিও সরকার দাবি করছে, বর্তমানে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে, তবুও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকার পরিসংখ্যান নয়, টিকার কার্যকারিতা, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছানোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
চিকিৎসকদের একটি অংশের মতে, কোভিড-পরবর্তী সময়ে অনেক শিশুর নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হয়েছিল। সেই প্রভাব এখন সামনে আসছে। এছাড়া কিছু এলাকায় টিকা নিয়ে ভুল তথ্য, গুজব এবং অনীহার কারণেও বহু শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি। ফলে দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে থাকা হাম আবারও মহামারির রূপ নিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিল, নিয়মিত টিকাদানে সামান্য ঘাটতিও বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব ডেকে আনতে পারে। কারণ হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। আক্রান্ত একজন শিশুর সংস্পর্শে এলে টিকা না নেওয়া বহু শিশু দ্রুত সংক্রমিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি টিকাদান অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সচেতনতা ও শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থাও এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অভিভাবকদের অনেকে অভিযোগ করছেন, স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সচেতনতা কার্যক্রম ছিল না। আবার কেউ কেউ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকা সংকট বা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলেছেন। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে এবং ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলায় বিশেষ মেডিকেল টিম কাজ শুরু করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু স্বাস্থ্যখাতের সংকট নয়, এটি দেশের শিশু নিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্যের সামগ্রিক সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা। একটি রোগ, যেটিকে প্রায় নির্মূল পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছিল, সেটি আবার প্রাণঘাতী রূপে ফিরে আসা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে। এখন সরকার কত দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সন্তান হারানো পরিবারগুলোর জন্য এই সংকট শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি গভীর মানবিক বেদনার নাম। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, অসহায়ত্ব এবং রাষ্ট্রের প্রতি এক ধরনের প্রশ্ন। তাই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নয়, জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবেই দেখতে হবে।