হাম সংকটে শিশুদের জন্য ভেন্টিলেটর দিলো রেডিয়েন্ট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
  • ৯ বার
হামের প্রাদুর্ভাব: ১০টি ভেন্টিলেটর দিলো রেডিয়েন্ট

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে যখন একের পর এক শিশু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, ঠিক তখনই জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সহায়তায় এগিয়ে এসেছে দেশের অন্যতম শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। গুরুতর অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত উন্নতমানের ১০টি নিওনেটাল ও পেডিয়াট্রিক ভেন্টিলেটর প্রদান করেছে। স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে এই সহায়তা নবজাতক ও শিশুদের জীবনরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মঙ্গলবার রাজধানীতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ভেন্টিলেটরগুলোর কাগজপত্র হস্তান্তর করেন রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের বোর্ড সদস্য মুসাওয়াত শাম্স জাহেদী। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এই ভেন্টিলেটরগুলো বিশেষভাবে নবজাতক ও শিশুদের জন্য তৈরি অত্যাধুনিক জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম। গুরুতর শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া বা হামজনিত জটিলতায় আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় এসব যন্ত্র অত্যন্ত কার্যকর। বিশেষ করে আইসিইউ ও নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে এসব ভেন্টিলেটর জরুরি সহায়তা হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের চাপ বাড়তে থাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম শুধু জ্বর বা চামড়ায় ফুসকুড়ি তৈরি করে না; অনেক ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও মস্তিষ্কের জটিল সংক্রমণের মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। ফলে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট প্রয়োজন হয় এমন রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।

রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন এবং মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সহায়তা এবং জরুরি স্বাস্থ্য সংকটে সরকারের পাশে থাকার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে শিশুস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

এটি রেডিয়েন্টের প্রথম সহায়তা নয়। এর আগে গত ৩১ মার্চ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুই সেট নিওনেটাল ও পেডিয়াট্রিক ভেন্টিলেটর সরবরাহ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বিভাগীয় ও বড় হাসপাতালগুলোতে এ ধরনের আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রের সংখ্যা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে বেসরকারি খাতের এমন সহায়তা সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হচ্ছে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে হাম পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৯ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৩ শিশু এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ৬ শিশু। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ১০৫ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং ৮৭ শিশুর শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম ধরা পড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে মোট ৭ হাজার ২৪ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৬ হাজার ৮৮১ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩২ হাজার ৮৭৭ শিশু। তবে এখন পর্যন্ত উপসর্গ ও নিশ্চিত হাম মিলিয়ে মোট ৪২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই পরিসংখ্যান জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

শিশু হাসপাতালগুলোতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন অসংখ্য পরিবার অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে ছুটে আসছে চিকিৎসার আশায়। কোথাও মায়ের কোলজুড়ে জ্বরাক্রান্ত শিশু, কোথাও আবার আইসিইউর সামনে উদ্বিগ্ন বাবা-মায়ের দীর্ঘ অপেক্ষা। চিকিৎসকদের ভাষ্য, সময়মতো টিকা না পাওয়া এবং কিছু এলাকায় স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাব বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এলে দ্রুত অন্য শিশুরাও আক্রান্ত হতে পারে। যদিও সরকার দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে, তবুও বহু এলাকায় এখনো শতভাগ শিশু টিকার আওতায় আসেনি। এছাড়া কোভিড-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছিল, যার প্রভাব এখন দৃশ্যমান হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু টিকা নয়, হাসপাতালের চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি। কারণ গুরুতর আক্রান্ত শিশুদের বাঁচাতে অক্সিজেন, নিবিড় পরিচর্যা এবং ভেন্টিলেটর সাপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই রেডিয়েন্টের দেওয়া আধুনিক ভেন্টিলেটরগুলো চিকিৎসা ব্যবস্থায় তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বলেন, সরকার হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। দেশের অধিকাংশ জেলায় টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ওষুধ সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি দেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থারও বড় পরীক্ষা। প্রতিটি শিশুমৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। ফলে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত সহযোগিতাও এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

হামের প্রাদুর্ভাবের এই কঠিন সময়ে রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের ভেন্টিলেটর সহায়তা তাই শুধু একটি করপোরেট অনুদান নয়; বরং এটি অসুস্থ শিশুদের জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক উদ্যোগ হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত