প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের সেশনজট সমস্যার সমাধান এবং নির্ধারিত সময়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করার লক্ষ্যে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, একজন শিক্ষার্থীর এসএসসি সম্পন্ন করতে যাতে ১০ বছরের একদিনও অতিরিক্ত সময় না লাগে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে নীতিগতভাবে কাজ চলছে। এই উদ্যোগকে শিক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোর একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার রাজধানীর ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ এবং ওমেরা রিনিউয়েবল এনার্জি লিমিটেডের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন শিক্ষা ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার শিক্ষা খাতে কোনো ধরনের কার্পণ্যতা করছে না। বরং শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করতে একের পর এক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে যাতে কোনো সেশনজট না হয়, সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তাদের শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ শেষ করতে পারে, সেটাই এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
তিনি আরও বলেন, “এসএসসি শেষ করতে ১০ বছরের একদিনও যাতে সময় বেশি না লাগে, সেই পরিকল্পনা আমরা করছি। এ বিষয়ে আজই একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থার সময় ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। আর সেই মানবসম্পদ গঠনের ভিত্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা। তাই শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকার কাজ করছে। তিনি বলেন, সময়মতো পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশ নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আরও স্থিতিশীলতা পাবে এবং উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে প্রবেশের পথ সহজ হবে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাবের হোসেন বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ খরচ কমানোর উদ্যোগটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। ওমেরা রিনিউয়েবল এনার্জির সঙ্গে এই চুক্তির ফলে প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ব্যয় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ৬০০ ওয়াট ক্ষমতার এই সোলার প্রকল্পটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, বরং দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের নতুন এই উদ্যোগ যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা সেশনজট অনেকাংশে কমে আসবে। বিশেষ করে এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি বড় স্বস্তির বিষয় হবে। কারণ সময়মতো শিক্ষা কার্যক্রম শেষ না হলে শিক্ষার্থীদের বয়স ও শিক্ষাজীবনের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা ভবিষ্যৎ কর্মজীবনেও প্রভাব ফেলে।
অভিভাবকদের একটি অংশ মনে করছেন, শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণা আশাব্যঞ্জক হলেও এর বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে বিভিন্ন সময় সেশনজট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসনিক জটিলতা, পরীক্ষার বিলম্ব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যবস্থাপনার কারণে তা পুরোপুরি সফল হয়নি। তাই এবার নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
অন্যদিকে শিক্ষক সমাজ বলছে, পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে সমন্বয় আনা গেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব। তবে এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার আরও বাড়াতে হবে।
সরকারের শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা শুধু পরীক্ষার সময়সূচি নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক সংস্কার প্রক্রিয়া। পাঠ্যসূচি, মূল্যায়ন পদ্ধতি, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাপী উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার কঠোর নিয়ম রয়েছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশে এখনো অনেক ক্ষেত্রে বিলম্ব, সেশনজট এবং অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে সরকারের এই উদ্যোগ শিক্ষাব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের দিকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে।
সব মিলিয়ে, শিক্ষামন্ত্রীর নতুন পরিকল্পনা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতিশীলতা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং মাঠ পর্যায়ের কার্যকারিতার ওপর। তবুও দীর্ঘদিনের সেশনজট সমস্যা সমাধানের পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।