প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জোরদার করতে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাজ্য। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত বহুজাতিক মিশনে বিপুল সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। এই সিদ্ধান্তের ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার ব্রিটিশ সরকারের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্য ড্রোন, আধুনিক যুদ্ধবিমান ইউরোফাইটার টাইফুন, মাইন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয়করণে সক্ষম বিশেষায়িত প্রযুক্তি এবং রয়্যাল নেভির যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস ড্রাগন মোতায়েন করবে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত তেল পরিবহন রুটে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু সামরিক সরঞ্জামই নয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। মাইন শনাক্তকারী ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য নতুন করে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড, যা প্রায় ১৫ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ, তহবিল অনুমোদন দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। এই অর্থ সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে ব্যয় করা হবে।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি এক ভার্চুয়াল বৈঠকে এই ঘোষণা দেন, যেখানে বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈঠকে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে এই মিশন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাজ্যের এক হাজারেরও বেশি সেনাসদস্য সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে নিয়োজিত রয়েছে বলে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে। এই বাহিনীগুলো মূলত সমুদ্র নিরাপত্তা, নজরদারি এবং সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধে কাজ করছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুটগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের বড় একটি অংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই জলপথে বিভিন্ন সময় উত্তেজনা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখা দেওয়ায় আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো এখানে নজরদারি ও সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্যের এই সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা সামরিক উপস্থিতির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ। বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি ও যুদ্ধবিমান মোতায়েনের বিষয়টি অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এই রুট দিয়ে শুধু তেল নয়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহনও হয়ে থাকে। ফলে এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, এই মিশন কোনো সংঘাত উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, বরং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা এবং সম্ভাব্য মাইন বা ড্রোন হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় এই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়তে পারে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাজ্যের এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধি শুধু একটি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি বড় কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।