প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে আবারও রক্তক্ষয়ী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে লেবাননে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি বাহিনীর একাধিক হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নিহতদের মধ্যে একজন সেনা সদস্য, একজন শিশু এবং দুইজন উদ্ধারকর্মী রয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই হামলা নতুন করে সীমান্ত পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, মঙ্গলবার দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে এই হামলাগুলো চালানো হয়। প্রথম ঘটনায় নাবাতিয়া শহরে একটি হামলায় পাঁচজন প্রাণ হারান। এরপর জেবচিত এলাকার কাছে আরেকটি হামলায় একজন সেনা সদস্য ও এক সিরীয় নাগরিকসহ চারজন নিহত হন। একই দিনে বিন্ট জেবাইল এলাকায় পৃথক আরেকটি হামলায় এক শিশু ও এক নারীসহ আরও চার বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।
এই ধারাবাহিক হামলায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। উদ্ধারকর্মীরা জানান, কিছু এলাকায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ফলে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা মূলত হিজবুল্লাহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ও যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে এই অভিযান চালিয়েছে। তবে লেবাননের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসব হামলায় সাধারণ নাগরিকরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী।
লেবানন ও ইসরাইল সীমান্তে গত কয়েক মাস ধরেই উত্তেজনা বিরাজ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ১৬ এপ্রিল দুই দেশের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দিলেও বাস্তবে সেই চুক্তি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। সীমান্ত এলাকায় মাঝেমধ্যেই পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংঘাতের অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে হিজবুল্লাহ, ইসরাইল এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন শক্তির অবস্থান এই উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় তারা হিজবুল্লাহর ঘাঁটি ধ্বংসের দাবি করলেও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বহু সাধারণ গ্রাম ও বেসামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহও ইসরাইলি সীমান্তে রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। গত মার্চের শুরুতে ইসরাইলি বাহিনী আবারও দক্ষিণ লেবাননে প্রবেশ করে কিছু এলাকা দখলে নেয় এবং বেশ কয়েকটি গ্রাম ধ্বংস করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার দুই পক্ষকেই বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানালেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতা আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের হামলা শুধু মানবিক বিপর্যয়ই সৃষ্টি করছে না, বরং পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। লেবাননের অর্থনীতি ইতোমধ্যে সংকটে রয়েছে, তার ওপর নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিনের আতঙ্কে তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। শিশুদের স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে, হাসপাতালগুলোতে আহতদের চাপ বেড়েছে এবং খাদ্য ও ওষুধের সংকটও দেখা দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মহল এই হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা দ্রুত উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানালেও বাস্তবে কোনো কার্যকর সমাধান এখনো দেখা যায়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থির পরিস্থিতিতে লেবানন-ইসরাইল সীমান্ত আবারও বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার নিতে পারে, যার প্রভাব পুরো অঞ্চলে পড়বে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি নতুন হামলা যেন আরও একটি মানবিক বিপর্যয়ের অধ্যায় যোগ করছে লেবাননের ইতিহাসে।