প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, ইরাক এবং পাকিস্তানের মধ্যে জ্বালানি পরিবহণ সংক্রান্ত একাধিক সমঝোতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহণে ইরানের সঙ্গে এই দুই দেশের নতুন সমঝোতা পৌঁছানোর ফলে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই অঞ্চল দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে এই রুটে জাহাজ চলাচল অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই ইরানের সঙ্গে ইরাক ও পাকিস্তানের নতুন জ্বালানি সমঝোতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সূত্র অনুযায়ী, বাগদাদ ও তেহরানের মধ্যে গোপন সমঝোতার আওতায় ইরাকের দুটি বড় তেলবাহী জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল বলে জানা গেছে। এই পরিবহণে ইরানের নিয়ন্ত্রণমূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভূমিকা ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দেশই বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশটির অর্থনীতি মূলত তেলনির্ভর হওয়ায় জ্বালানি রপ্তানি অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আরও জাহাজ চলাচলের অনুমতি পেতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তার মতে, ইরাকের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
অন্যদিকে পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের জ্বালানি সহযোগিতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কাতার থেকে এলএনজি বহনকারী দুটি জাহাজ পাকিস্তানের দিকে রওনা হয়েছে, যা ইরানের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। যুদ্ধের আগে পাকিস্তান নিয়মিতভাবে প্রতি মাসে প্রায় ১০টি এলএনজি কার্গো পেত। কিন্তু চলমান সংঘাত ও উত্তেজনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশটিতে জ্বালানি সংকট ও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই নতুন কৌশল হরমুজ প্রণালির ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের গবেষক ক্লদিও স্টয়ার মন্তব্য করেছেন, হরমুজ এখন আর কেবল একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে একটি নিয়ন্ত্রিত কৌশলগত করিডরে পরিণত হচ্ছে, যেখানে ইরানের প্রভাব ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষক সল কেভোনিক মনে করেন, যদি আরও দেশ ইরানের সঙ্গে এই ধরনের সমঝোতায় যুক্ত হয়, তাহলে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে। তার মতে, যুদ্ধের আগে প্রতিমাসে প্রায় তিন হাজার জাহাজ এই প্রণালি ব্যবহার করলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে।
জ্বালানি বাজারেও এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বলে জানা গেছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। একই সময়ে ইউরোপ ও এশিয়ায় এলএনজির দাম ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে এশিয়ার দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিগুলোর জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একদিকে ইরান তার কৌশলগত অবস্থান শক্ত করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ফলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলকে ঘিরে আরও জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ইরান, ইরাক ও পাকিস্তানের এই নতুন জ্বালানি সমঝোতা হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।