প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধ বা অবসায়নের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ খেলাপি ঋণ, আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থতা এবং আর্থিক অনিয়মের দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সাম্প্রতিক সভায় এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পর ২০২৬ সালের জুলাই থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
অবসায়নের তালিকায় থাকা পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। এই প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে ভুগছিল এবং তাদের কার্যক্রম প্রায় অচল অবস্থায় পৌঁছায় বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় পুরো ঋণই এখন অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে। এই কারণে তারা আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ব্যাংক রেজুলেশন আইনের আওতায় এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধাপে ধাপে বন্ধ করা হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে, যিনি সম্পূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন। পাশাপাশি আরও দুইজন কর্মকর্তা যুক্ত থাকবেন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে অকার্যকর ঘোষণা করা হবে।
তিনি আরও জানান, অবসায়নের ফলে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এই অর্থ সরকার আগামী বাজেটে বরাদ্দ রাখার আশ্বাস দিয়েছে। এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংকটে পড়লে তা পুনর্গঠন, একীভূতকরণ বা অবসায়নের মাধ্যমে সমাধান করা হয়। একই সঙ্গে সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে পাওনাদারদের অর্থ পরিশোধের বিধানও রয়েছে।
এর আগে গত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ২০টি এনবিএফআইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। পরবর্তীতে পর্যালোচনার ভিত্তিতে ৯টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে অবসায়নের তালিকায় রাখা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তালিকায় পরিবর্তন আসে এবং কিছু প্রতিষ্ঠান বাদ দেওয়া হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনটি প্রতিষ্ঠান—জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স এবং বিআইএফসি—তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। পরে আরও কিছু সমন্বয়ের মাধ্যমে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে অবসায়নের জন্য নির্বাচিত করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের বিপর্যয়ের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব। বিশেষ করে পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে কিছু বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থা আরও খারাপ হয়।
বিশেষভাবে আলোচিত পিকে হালদার কাণ্ডে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। তার বিরুদ্ধে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স এবং বিআইএফসির বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে, যা এই খাতের সংকটকে আরও গভীর করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবসায়ন সিদ্ধান্ত আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও, আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে আরও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন সংকট এড়াতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।