প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে লাগামহীন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ধরে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন না হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আসন্ন জাতীয় বাজেটের আগেই ‘জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫’-এর চূড়ান্ত সুপারিশ প্রকাশ এবং দ্রুত নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে সরকারি কর্মচারীদের একটি সংগঠন।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী কল্যাণ সমিতি কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির পক্ষ থেকে মঙ্গলবার (১২ মে) এ দাবি জানানো হয়। সংগঠনটির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক ও সদস্য সচিব আশিকুল ইসলামের স্বাক্ষরিত এক আবেদনপত্রে বলা হয়, বর্তমান বেতন কাঠামো সময়োপযোগী না হওয়ায় সাধারণ সরকারি কর্মচারীরা আর্থিকভাবে চরম চাপে রয়েছেন।
আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নবম পে স্কেল এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এই সময়ের মধ্যে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, চিকিৎসা ব্যয়সহ জীবনযাত্রার সব খরচ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় বেতন কাঠামো অপরিবর্তিত থাকায় বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সংগঠনটির নেতারা অভিযোগ করেন, অনেক কর্মচারী এখন বাধ্য হয়ে ব্যাংক ঋণ ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এতে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায় পারিবারিক জীবনেও প্রভাব পড়ছে বলে দাবি করা হয়।
তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা চললেও সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট রূপরেখা ঘোষণা করা হয়নি। এতে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।
অন্যদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন পে স্কেল নিয়ে চলমান আলোচনায় প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তব অগ্রগতি না থাকায় হতাশা বাড়ছে বলে সংগঠনটি দাবি করেছে।
আবেদনপত্রে আরও বলা হয়, বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে বিদ্যমান বেতন কাঠামোর কোনো সামঞ্জস্য নেই। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়া অনেকের জন্যই প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংগঠনটি মনে করে, সময়োপযোগী পে স্কেল বাস্তবায়ন না হলে সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতাও প্রভাবিত হতে পারে। কারণ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে—যেমন প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আইনশৃঙ্খলা—কর্মরত কর্মচারীরা বর্তমান পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত মানসিক ও আর্থিক চাপের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন।
তারা আরও বলেন, সরকারি কর্মচারীরা রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেও তাদের জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে বেতন কমিশনের সুপারিশ চূড়ান্ত করে বাজেট ঘোষণার আগেই তা বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস একটি দীর্ঘদিনের দাবি। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক চাপ স্পষ্টভাবে বাড়ছে।
এদিকে আসন্ন জাতীয় বাজেটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের এই দাবি সেই প্রত্যাশারই অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বেতন কাঠামো হালনাগাদ না হলে শুধু কর্মচারীরাই নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যেও প্রভাব পড়তে পারে। কারণ ভোক্তা ব্যয় ও জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে আয় সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে সামাজিক চাপ বাড়ে।
বর্তমানে সরকারের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের দাবি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেটকে ঘিরে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা যেমন বাড়ছে, তেমনি চাপও বাড়ছে সরকারের ওপর। এখন দেখার বিষয়, নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকার কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং তা কবে নাগাদ বাস্তবায়নের পথে এগোয়।