প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের স্বর্ণের বাজারে আবারও বেড়েছে দাম। নতুন মূল্য অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ এখন বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭১১ টাকায়। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে ভরিপ্রতি ২ হাজার ২১৬ টাকা বাড়িয়ে এই নতুন দর নির্ধারণ করেছে। গত ৭ মে সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হওয়া এই দাম আজ বৃহস্পতিবার (১৪ মে) পর্যন্ত বহাল রয়েছে।
স্বর্ণের দাম বাড়ার এই ধারা দেশের সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিয়ে ও পারিবারিক অনুষ্ঠানের মৌসুমে স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধি অনেকের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি এবং স্থানীয়ভাবে তেজাবি স্বর্ণের দাম বাড়ার কারণেই নতুন এই সমন্বয় করতে হয়েছে।
Bangladesh Jewellers Association (বাজুস) জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে পিওর গোল্ড বা তেজাবি স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে নতুন দর নির্ধারণ করা হয়েছে। সংগঠনটির মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার এবং আমদানি ব্যয়ও স্বর্ণের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
গত ৬ মে সর্বশেষ দাম সমন্বয়ের সময় ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ২ লাখ ৪২ হাজার ৪৯৫ টাকা। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে নতুন করে দাম বাড়ায় বাজারে অস্থিরতা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম বাড়ার কারণে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অনেকেই এখন স্বর্ণ কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বিয়ের গহনা কেনা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ স্বর্ণকে এখনো নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি এবং বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে অনেকেই স্বর্ণে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। এর প্রভাবও স্থানীয় বাজারে পড়ছে বলে জানিয়েছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিশ্ববাজারে সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বাজার বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, ডলারের অস্থিরতা এবং ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ খাত থেকে সরে গিয়ে স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদে ঝুঁকছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বাজারেও।
বাংলাদেশে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৬৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছে বাজুস। এর মধ্যে ৩৫ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং ২৮ বার কমানো হয়েছে। এত ঘন ঘন মূল্য পরিবর্তন দেশের স্বর্ণবাজারে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করে না; বরং আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডলারের দাম বাড়লে স্বর্ণ আমদানির খরচও বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে প্রভাব ফেলে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বর্ণের দাম আরও বাড়তে পারে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতির ওপর। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বর্ণবাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে ক্রেতাদের একটি অংশ মনে করছেন, স্বর্ণ এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অনেকেই অভিযোগ করছেন, প্রতি মাসেই দামের পরিবর্তনের কারণে বাজেট পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চয় করে গহনা কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্বর্ণের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি নতুন কিছু নয়। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় বাজারেও দাম সমন্বয় করতে হয়। না হলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়বেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে আমদানি ব্যবস্থাপনা সহজ করা, বাজার তদারকি বাড়ানো এবং অবৈধ স্বর্ণ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ জরুরি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
সব মিলিয়ে, দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এতে একদিকে যেমন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি আর্থিক চাপ। বাজার পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট সবার।