প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় যখন সারাদেশজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে, তখন নিহত শিশুটির পরিবারের পাশে দাঁড়ালেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় রামিসাদের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন তিনি। একইসঙ্গে রামিসার বড় বোন রাইসা আক্তারের লেখাপড়া ও ভবিষ্যতের পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে বৃহস্পতিবার রাত থেকেই এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। রাত প্রায় ১০টার দিকে তিনি রামিসার বাসায় পৌঁছান। সেখানে কিছু সময় অবস্থান করে শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের প্রতি সমবেদনা জানান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেসসচিব আতিকুর রহমান রুমন সাংবাদিকদের জানান, রামিসার পরিবারের হাতে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে রামিসার বড় বোন রাইসা আক্তারের শিক্ষাজীবন, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ দেখভালের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারটির সার্বিক সহায়তা নিশ্চিত করার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
শোকাহত পরিবেশে রামিসার মা-বাবা প্রধানমন্ত্রীর সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা বলেন, তারা তাদের সন্তানের হত্যার বিচার চান এবং এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আর কোনো পরিবারকে দেখতে না হয়, সেটিই তাদের একমাত্র দাবি। প্রধানমন্ত্রী তাদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান এবং দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আশ্বাস দেন বলে জানা গেছে।
গত মঙ্গলবার রাজধানীর পল্লবীর একটি বাসা থেকে রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর পুরো দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। পুলিশ জানায়, সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর অভিযুক্ত সোহেল রানা শিশুটিকে নিজের কক্ষে ডেকে নেয়। পরে তাকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। ঘটনার ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে তোলে মরদেহ গোপনের নির্মম পদ্ধতি। খাটের নিচ থেকে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ উদ্ধার করা হয় এবং বাথরুমে রাখা একটি বালতির ভেতর পাওয়া যায় তার বিচ্ছিন্ন মাথা।
ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযুক্তের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। তবে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। পরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তারের পর আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সোহেল রানা ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার নৃশংসতা এবং প্রাপ্ত আলামত বিবেচনায় মামলাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুক, এক্স এবং ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষ শিশু রামিসার জন্য বিচার দাবি করছেন। অনেকেই দেশের বিচার ব্যবস্থা ও শিশু নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক নেতারাও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেন, রামিসার বাবা দেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে যে হতাশা প্রকাশ করেছেন, তা “অমূলক নয়”। তিনি স্বীকার করেন, অতীতে বিচার দীর্ঘসূত্রতায় অনেক পরিবার হতাশ হয়েছে। তবে বর্তমান সরকার এই মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান তিনি।
ঘটনার পর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, দেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বিচার নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক বিকারগ্রস্ত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করাও জরুরি।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকে মানসিকভাবে আঘাত করে। বিশেষ করে একই বয়সী শিশুদের অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। তারা মনে করছেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—তিন পক্ষকেই আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর এবং রামিসার বড় বোনের দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণাকে অনেকে মানবিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি সহানুভূতির বার্তা নয়, বরং জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনারও একটি প্রচেষ্টা। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এই ঘটনায় যেন দ্রুত বিচার নিশ্চিত হয় এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
রামিসার ছোট্ট জীবনের করুণ পরিণতি দেশবাসীকে নাড়া দিয়েছে গভীরভাবে। তার পরিবার আজও বিশ্বাস করতে পারছে না, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাদের আদরের সন্তান এমন নিষ্ঠুরতার শিকার হতে পারে। শোকের ভারে নুয়ে পড়া সেই পরিবার এখন একটাই প্রত্যাশা করছে—রামিসার হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি এবং আর কোনো শিশুর জীবনে যেন এমন ভয়াবহতা নেমে না আসে।