প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবাকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘হুমকি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার পর ওয়াশিংটন ও হাভানার মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আদর্শিক সংঘাতের ইতিহাসের মধ্যে রুবিওর সাম্প্রতিক মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে সাবেক কিউবান নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা দায়েরের ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কো রুবিও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কিউবার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সমঝোতার সম্ভাবনা খুবই সীমিত। যদিও তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার ও দায়িত্ব রাখেন।
রুবিওর বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মাত্র একদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ১৯৯৬ সালে দুটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করে মার্কিন নাগরিক হত্যার অভিযোগে রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। ওই ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্কের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ওই ঘটনায় কিউবার শীর্ষ নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। যদিও হাভানা বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান অবস্থান কিউবার বিরুদ্ধে আরও কঠোর নীতি গ্রহণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে মার্কো রুবিও, যিনি দীর্ঘদিন ধরেই কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত, তিনি পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিউবান বংশোদ্ভূত এই মার্কিন রাজনীতিক অতীতেও বহুবার কিউবার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে রুবিও বলেন, “যদি রাউল কাস্ত্রোকে যুক্তরাষ্ট্রে আনার কোনো পরিকল্পনা থাকে, তাহলে সেটা আমি গণমাধ্যমকে কেন জানাব?” তার এই মন্তব্যকে ঘিরে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আন্তর্জাতিক চাপ বা বিশেষ কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে কাস্ত্রোকে বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা করতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চও জানিয়েছেন, তাদের প্রত্যাশা কাস্ত্রো স্বেচ্ছায় অথবা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে হাজির হবেন। যদিও বাস্তবে এমন সম্ভাবনা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে। কারণ কিউবার বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো এবং চীনা-রুশ সমর্থনের কারণে দেশটির ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগ সহজ নয়।
রুবিও আরও অভিযোগ করেন, কিউবা পুরো অঞ্চলে “সন্ত্রাসবাদের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক” হিসেবে কাজ করছে। তিনি দাবি করেন, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন বামপন্থী গোষ্ঠী ও কিছু বিতর্কিত সংগঠনের সঙ্গে হাভানার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও ওয়াশিংটন বহুবার কিউবাকে সন্ত্রাসবাদে সহায়তাকারী রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি রুবিওর বক্তব্যকে “মিথ্যা ও উসকানিমূলক” বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র কিউবার বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনের পরিবেশ তৈরি করতে চাচ্ছে।
বর্তমানে ভয়াবহ জ্বালানি ও খাদ্যসংকটে ভুগছে কিউবা। দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাট, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। হাভানার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং তেল অবরোধের কারণেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
তবে ওয়াশিংটনের অবস্থান ভিন্ন। রুবিও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র কিউবাকে ১০০ মিলিয়ন ডলারের মানবিক সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে এবং সেই সহায়তা গ্রহণও করেছে হাভানা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিউবার জনগণের দুর্ভোগের জন্য মূলত দেশটির কমিউনিস্ট নেতৃত্ব দায়ী। তিনি বলেন, জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারায় কিউবা দীর্ঘদিন ধরে সংকটে নিমজ্জিত।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কিউবাকে “ব্যর্থ রাষ্ট্র” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তার প্রশাসন মানবিক সহায়তার মাধ্যমে দেশটির জনগণকে সহযোগিতা করতে চায়। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কিউবান-আমেরিকানদের বড় একটি অংশ নিজেদের জন্মভূমিকে নতুনভাবে গড়ে উঠতে দেখতে চান।
ট্রাম্প আরও বলেন, “অন্য প্রেসিডেন্টরা ৫০-৬০ বছর ধরে কিছু একটা করার কথা ভেবেছেন। মনে হচ্ছে আমিই হয়তো সেটা করতে যাচ্ছি।” তার এই বক্তব্যকে অনেকে কিউবায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। যদিও সমালোচকরা বলছেন, এমন বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ অনেকটা নিকোলাস মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে পূর্বে নেওয়া মার্কিন অবস্থানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ভেনেজুয়েলায় যেমন অর্থনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল, কিউবার ক্ষেত্রেও অনুরূপ কৌশল দেখা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ ফ্লোরিডা থেকে অ্যাডিস লাস্ট্রেস মোরেরা নামের এক নারীকে আটক করেছে বলে জানিয়েছেন রুবিও। তিনি কিউবার সামরিক নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর এক শীর্ষ কর্মকর্তার বোন বলে দাবি করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে হাভানার কমিউনিস্ট সরকারকে সহায়তা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই ঘটনাও দুই দেশের মধ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যকার এই সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো লাতিন আমেরিকার ভূরাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে রাশিয়া, চীন এবং ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর সঙ্গে কিউবার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ওয়াশিংটনের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মূল ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ কিউবান নাগরিকরা। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, খাদ্যসংকট এবং জ্বালানি ঘাটতির কারণে দেশটির মানুষের জীবনযাত্রা ইতোমধ্যে কঠিন হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে যদি নতুন করে রাজনৈতিক বা সামরিক উত্তেজনা বাড়ে, তাহলে পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক মাস যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা থাকলেও উভয় পক্ষের বক্তব্যে যে কঠোর অবস্থান দেখা যাচ্ছে, তাতে সংকট সহজে নিরসনের সম্ভাবনা খুব বেশি দেখছেন না বিশ্লেষকরা।