প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে কুমিল্লার আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলা। তদন্তে নতুন অগ্রগতি এবং একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তার গ্রেফতারের ঘটনায় মামলাটি নতুন মোড় নিয়েছে। সাম্প্রতিক এই অগ্রগতির পর ভুক্তভোগী পরিবার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আবারও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা জেগে উঠেছে।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী তনুকে। টিউশনি শেষ করে বাড়ি না ফেরায় দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর সেনানিবাসের পাওয়ার হাউস এলাকার জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ ওঠে, তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল। তবে শুরু থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন ছিল তদন্ত সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
মামলার প্রথম ধাপে স্থানীয় থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পরে দায়িত্ব যায় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও সিআইডির হাতে। কিন্তু দীর্ঘ তদন্তেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ২০২০ সাল থেকে মামলাটির দায়িত্ব নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এরপরও বহু বছর ধরে মামলাটি ছিল অমীমাংসিত, যা দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
তনুর পোশাক থেকে সংগ্রহ করা ফরেনসিক নমুনা মামলার তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই ডিএনএ পরীক্ষায় চারজন অজ্ঞাত পুরুষের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়। তবে দীর্ঘ সময়েও সেই প্রোফাইলগুলোর সঙ্গে কোনো সন্দেহভাজনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্ত কার্যত থমকে ছিল।
তবে সম্প্রতি মামলাটিতে নতুন মোড় আসে। তদন্ত কর্মকর্তারা নতুন করে মাঠে নামার পর সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করেন। অভিযোগ রয়েছে, তনুর সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি তনুকে নিয়ে যেতেন। তবে সর্বশেষ একটি কনসার্টে তনু অনুপস্থিত থাকায় তার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয় বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেফতারের পর হাফিজুর রহমানকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং তিনি বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, তার বক্তব্যের অসংগতি যাচাই করা হচ্ছে এবং প্রযুক্তিগত প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
মামলার তদন্তে এখন আরও তিনজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা হলেন সাবেক সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান, সৈনিক শাহিন আলম এবং জাহিদুল ইসলাম। তাদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা। কুমিল্লা আদালতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিএনএ প্রোফাইল বিশ্লেষণে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে সন্দেহভাজনদের মিল খুঁজে বের করার কাজ চলছে।
২০১৬ সালে ঘটনার পর থেকেই তনু হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেনানিবাসের মতো সংরক্ষিত এলাকায় এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটায় জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। দুই দফা ময়নাতদন্তেও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ না হওয়ায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এটি দেশের অন্যতম আলোচিত ও অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে রয়ে যায়।
তনুর বাবা দীর্ঘ সময় ধরে মেয়ের বিচার চেয়ে আসছেন। তিনি বারবার দাবি করেছেন, প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। সাম্প্রতিক গ্রেফতারের পর তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, এবার হয়তো ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে। তার ভাষায়, যারা তার মেয়েকে হত্যা করেছে, তারা কোনোভাবেই পার পাবে না।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় পর হলেও মামলার এই অগ্রগতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফরেনসিক প্রমাণ ও নতুন তদন্ত কার্যক্রম মিলিয়ে সত্য উদঘাটনের একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলাটি যদি সফলভাবে সমাধান হয়, তাহলে এটি দেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
তারা আরও বলছেন, এমন আলোচিত ও সংবেদনশীল মামলার দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অপরাধ করে পার পেয়ে না যায়। তনু হত্যা মামলার অগ্রগতি তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত বিচার নয়, বরং পুরো বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থার প্রশ্নও হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, ফরেনসিক রিপোর্ট ও ডিএনএ বিশ্লেষণের চূড়ান্ত ফলাফল হাতে এলে মামলায় বড় ধরনের অগ্রগতি আসবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে সত্য উদঘাটনের পথ খুলে যেতে পারে।
দশ বছর পর নতুন এই অগ্রগতি তনুর পরিবারের জন্য একদিকে যেমন আশার আলো, অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘ প্রতীক্ষার যন্ত্রণার স্মৃতিও নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। এখন সবার দৃষ্টি তদন্তের পরবর্তী ধাপের দিকে, যেখানে হয়তো মিলতে পারে সেই প্রশ্নের উত্তর, যা এক দশক ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেছে।