এক দিনে ২৭৪ আরোহীর এভারেস্ট জয়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬
  • ৩১ বার
এক দিনে ২৭৪ আরোহীর এভারেস্ট জয়

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট আবারও নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হলো। নেপালের দিক থেকে একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক পর্বতারোহীর শীর্ষে পৌঁছানোর রেকর্ড গড়েছেন ২৭৪ জন আরোহী। এই অভূতপূর্ব ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার, যা পর্বতারোহণ জগতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

নেপালের পর্যটন বিভাগ এবং অভিযাত্রা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এই সংখ্যাটি এভারেস্ট অভিযানের ইতিহাসে নেপাল দিক থেকে একদিনে সর্বোচ্চ সফল আরোহণের রেকর্ড। ৮ হাজার ৮৪৯ মিটার উচ্চতার এই পর্বত, যা নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে অবস্থিত, সেখানে প্রতিবারই চূড়ায় ওঠা যেমন গৌরবের, তেমনি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

নেপালের এক্সপেডিশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ঋষি ভান্ডারি জানিয়েছেন, এর আগে নেপাল দিক থেকে একদিনে সর্বোচ্চ ২২৩ জন আরোহী ২০১৯ সালের ২২ মে এভারেস্ট জয় করেছিলেন। এবারের সংখ্যা সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বলেন, কিছু আরোহী এখনো বেসক্যাম্পে তাদের সফলতার তথ্য নিশ্চিত করেননি, ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

পর্যটন বিভাগের কর্মকর্তা হিমাল গৌতম জানান, প্রাথমিকভাবে ২৫০ জনের বেশি আরোহীর শীর্ষে পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে চূড়ান্ত সংখ্যা নিশ্চিত করতে ছবি ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাইয়ের কাজ চলছে। তিনি আরও জানান, এবারের মৌসুমে নেপাল সরকার মোট ৪৯৪টি আরোহণ অনুমতি দিয়েছে, যার প্রতিটির ফি প্রায় ১৫ হাজার মার্কিন ডলার।

এভারেস্ট অভিযানে এবারের রেকর্ড গড়ে ওঠার পেছনে যেমন রয়েছে বাড়তি আগ্রহ, তেমনি রয়েছে বিতর্কও। বিপুল সংখ্যক আরোহীর কারণে পর্বতের চূড়ার নিচের ভয়াবহ ‘ডেথ জোন’-এ দীর্ঘ সারি তৈরি হয়, যা অনেক সময় প্রাণঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এই অঞ্চলে অক্সিজেনের মাত্রা এতটাই কম যে, মানবদেহের জন্য সেখানে দীর্ঘক্ষণ টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভারেস্টে ভিড় বাড়ার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। অতীতে দেখা গেছে, অতিরিক্ত আরোহীর কারণে চূড়ার কাছাকাছি এলাকায় দীর্ঘ অপেক্ষা করতে গিয়ে অনেক পর্বতারোহী অসুস্থ হয়ে পড়েন বা প্রাণ হারান। তাই এভারেস্ট অভিযানের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে।

তবে নেপাল সরকার বলছে, পর্যটন খাত থেকে আয় বাড়ানো এবং অভিযাত্রাকে সংগঠিত করার লক্ষ্যেই তারা অনুমতির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ফি এবং কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছে যাতে শুধুমাত্র প্রস্তুত ও সক্ষম আরোহীরাই অভিযানে অংশ নিতে পারেন।

এবারের অভিযানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, চীনের তিব্বত অংশ থেকে কোনো আরোহী শীর্ষে পৌঁছাননি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, চীনা কর্তৃপক্ষ এ বছর আরোহণের অনুমতি দেয়নি, যার ফলে পুরো চাপ নেপাল দিকেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

বিশ্ব পর্বতারোহণ ইতিহাসে আগেও এভারেস্ট একাধিক রেকর্ড গড়েছে। ২০১৯ সালের ২৩ মে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুযায়ী, দুই দিক মিলিয়ে একদিনে সর্বোচ্চ ৩৫৪ জন আরোহী শীর্ষে পৌঁছেছিলেন। তবে এককভাবে নেপাল দিক থেকে এবারকার রেকর্ডটি সবচেয়ে বড় বলে বিবেচিত হচ্ছে।

অস্ট্রিয়াভিত্তিক ফুরটেনবাখ অ্যাডভেঞ্চারসের পরিচালক লুকাস ফুরটেনবাখ বলেন, পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ ও ভালো ব্যবস্থাপনা থাকলে বড় সংখ্যক আরোহীর জন্যও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তিনি দাবি করেন, তাদের দল ভিড়ের পেছনে থাকলেও কোনো বড় জটিলতার মুখে পড়েনি। তার মতে, অন্যান্য জনপ্রিয় পর্বতের তুলনায় এভারেস্টের সক্ষমতা অনেক বেশি।

তবে পর্বতারোহণ বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এই যুক্তির সঙ্গে একমত নন। তারা বলছেন, এভারেস্ট কোনো সাধারণ পর্যটন স্থান নয়, বরং চরম প্রতিকূল পরিবেশের একটি শৃঙ্গ, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি বহন করে। তাই সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং নিরাপত্তা ও অভিজ্ঞতা যাচাইকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

এভারেস্ট বেসক্যাম্পে অবস্থান করা অনেক আরোহী জানিয়েছেন, চূড়ায় ওঠার সময় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হওয়ায় অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। অক্সিজেন শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি, হাইপোক্সিয়া এবং হিমশীতল আবহাওয়া পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। তবুও বছরের পর বছর ধরে হাজারো পর্বতারোহী এই শৃঙ্গ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে নেপালে আসেন।

নেপাল সরকারের মতে, এভারেস্ট তাদের অন্যতম প্রধান পর্যটন আয়ের উৎস। প্রতি বছর লাখো পর্যটক এবং শত শত পর্বতারোহী দেশটির অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখেন। তবে একই সঙ্গে পরিবেশগত ক্ষতি, আবর্জনা বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এভারেস্টে একদিনে ২৭৪ জনের এই রেকর্ড যেমন পর্বতারোহণের জনপ্রিয়তা তুলে ধরছে, তেমনি এটি ভবিষ্যতে ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্নও তৈরি করছে।

এভারেস্ট জয় তাই শুধু একটি ক্রীড়া সাফল্য নয়, বরং মানবসাহস, প্রযুক্তি এবং সীমাবদ্ধতার এক জটিল সমন্বয়। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি ঝুঁকির বিষয়টি যত বেশি গুরুত্ব পাবে, ততই ভবিষ্যতের অভিযানগুলো আরও নিরাপদ ও টেকসই হবে—এমনটাই প্রত্যাশা বিশেষজ্ঞদের

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত