প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ নিয়ে চলতি মৌসুমে বিভাগটিতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ জনে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ মারা যাওয়া পাঁচ শিশুর মধ্যে দুইজন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, দুইজন শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে এবং একজন সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। মৃত শিশুদের বয়স ছিল অত্যন্ত কম, যাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিল মাত্র ৫ মাস বয়সী এক শিশু, আর অন্যরা ১০ মাস, ১ বছর, ৪ বছর এবং ৬ বছর বয়সী।
স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত শিশুদের বেশিরভাগই শুরুতে সাধারণ জ্বর, সর্দি ও র্যাশের মতো লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার কারণে জটিলতা বেড়ে গিয়ে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে পড়ে। ফলে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২৮৩ জন রোগী। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৭৪ জন সন্দেহভাজন রোগী ভর্তি হয়েছে। যদিও একই সময়ে নতুন করে কোনো ল্যাব-নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়নি, তবুও আক্রান্তের সংখ্যা ও সন্দেহভাজন রোগীর বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ মে পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ১৫৮ জন ল্যাব-নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যুবরণ করা শিশুদের মধ্যে চারজনের ক্ষেত্রে পরীক্ষায় হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছিল, বাকি শিশুদের ক্ষেত্রে উপসর্গের ভিত্তিতে হাম সন্দেহ করা হচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগ সাধারণত টিকা গ্রহণের মাধ্যমে অনেকাংশে প্রতিরোধযোগ্য। তবে টিকাদান কাভারেজ কমে যাওয়া, গ্রামীণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে এই ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। অনেক ক্ষেত্রে শয্যার অভাব, পর্যাপ্ত আইসোলেশন ব্যবস্থা না থাকা এবং জনবল সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি নজরদারি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার কথা জানিয়েছেন। বিশেষ করে টিকাদান কর্মসূচি দ্রুত বিস্তৃত করা, আক্রান্ত এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানো এবং অভিভাবকদের সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের প্রাদুর্ভাব রোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ এবং প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। একই সঙ্গে তারা গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। অনেক পরিবার তাদের শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছেন, আবার কেউ কেউ আগেভাগেই টিকা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো সংক্রামক রোগ যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলে তা বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে সিলেটের বর্তমান পরিস্থিতি একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের সব ধরনের প্রস্তুতি চলছে, তবে জনগণের সচেতনতা ছাড়া এই প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।