যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূকে হত্যা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬
  • ৪০ বার
যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূকে হত্যা

প্রকাশ: ২২ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নওগাঁর মহাদেবপুরে যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে এক গৃহবধূর নির্মম হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। মাত্র ২০ বছর বয়সী রেহানা নামের ওই গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তার পরিবার। ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর জন্য মরদেহ ঘরের ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয় বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর থেকে স্বামী ও শ্বশুর পালাতক থাকায় এলাকায় চরম উত্তেজনা ও শোক বিরাজ করছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাতে জেলার মহাদেবপুর উপজেলার সুলতানপুর এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। নিহত রেহানা নওগাঁর বক্তারপুর এলাকার সোহেল রানার মেয়ে। ২০২২ সালের এপ্রিলে পারিবারিকভাবে রতন নামের এক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী নগদ এক লাখ টাকা এবং প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র দেওয়া হয়। তবে বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই সংসারে শুরু হয় অশান্তি।

পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বিয়ের পর থেকেই রতন বিভিন্ন অজুহাতে ব্যবসার জন্য তিন লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে আসছিলেন। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এই টাকা দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় রেহানার ওপর শুরু হয় নিয়মিত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও নির্যাতন থেকে রেহানা মুক্তি পাননি বলে অভিযোগ স্বজনদের।

ঘটনার দিন রাতে আবারও যৌতুকের টাকা নিয়ে রেহানার সঙ্গে স্বামী রতনের তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এ সময় রতনের সঙ্গে তার মা জহুরা বেগমও নির্যাতনে অংশ নেন। একপর্যায়ে রেহানাকে বাঁশ দিয়ে আঘাত করা হলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর তাকে বেপরোয়া মারধর করা হয় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে বলে দাবি করেছে পরিবার।

পরিবারের আরও অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দিতে পরিকল্পিতভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে সাজানো হয়। মরদেহ ঘরের ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে রাতেই রেহানার পরিবারকে জানানো হয় যে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বজনরা রেহানার শরীরে স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান, যা মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত করে।

এই নির্মম ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত স্বামী রতন এবং তার বাবা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। স্থানীয়রা জানান, ঘটনার পর থেকে তাদের আর এলাকায় দেখা যায়নি। এতে এলাকায় চাঞ্চল্য ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

নিহতের পরিবার বলছে, দীর্ঘদিন ধরে যৌতুকের চাপ ও নির্যাতনের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে জানানো হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত এমন একটি মর্মান্তিক পরিণতি ঘটেছে।

এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিক সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নওগাঁ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। পুলিশ জানিয়েছে, রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

মহাদেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উমর ফারুক বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় এখনো মামলা দায়ের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

এই ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রতিবেশীরা বলছেন, রেহানা ছিলেন শান্ত ও সহনশীল স্বভাবের একজন তরুণী। সংসার টিকিয়ে রাখতে তিনি সব ধরনের নির্যাতন সহ্য করতেন বলে জানা গেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সহ্যশক্তিও তাকে বাঁচাতে পারেনি।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, যৌতুকের কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা এখনো গ্রামীণ সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত। আইন থাকলেও বাস্তবায়ন ও সামাজিক সচেতনতার ঘাটতির কারণে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে। তারা দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে। তারা দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সামাজিক সচেতনতা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

সব মিলিয়ে নওগাঁর এই ঘটনা আবারও দেশের সমাজে যৌতুক প্রথার ভয়াবহতা ও নারীর প্রতি সহিংসতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। এক তরুণী মায়ের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য এক গভীর প্রশ্ন রেখে গেছে—কবে বন্ধ হবে এই নিষ্ঠুরতার চক্র?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত