দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, নীতিনির্ধারণ এবং সরকারি সেবার মানোন্নয়নে তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।
এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সঠিক তথ্য ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ সম্ভব নয়। তাই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রতিটি ধাপে তথ্যের যথার্থতা, স্বচ্ছতা এবং সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি শক্তিশালী করা বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে তথ্য এখন শুধু প্রশাসনিক প্রয়োজনের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ফলে সরকারি তথ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ, আধুনিক এবং জনমুখী করে তোলা প্রয়োজন।
তিনি জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডারকে সমন্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সম্পদের ব্যবহার এবং সেবার কার্যকারিতা মূল্যায়ন আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের জন্য বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ বাড়বে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর মতে, তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে জনগণের আস্থাও বৃদ্ধি পায়। সরকারি কার্যক্রম সম্পর্কে মানুষের জানার অধিকার রয়েছে এবং তথ্যপ্রবাহ সহজ হলে জবাবদিহিতার পরিবেশ আরও শক্তিশালী হয়। তিনি বলেন, উন্নয়ন কার্যক্রমের সফলতা নির্ভর করে কতটা কার্যকরভাবে তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারের ফলে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে তথ্যের মান বজায় রাখা, তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভুল তথ্য প্রতিরোধ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য দক্ষ মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন জরিপ, গবেষণা এবং প্রশাসনিক তথ্যকে আরও সমন্বিত করার বিষয়ে কাজ চলছে। এর মাধ্যমে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বাস্তব পরিস্থিতির আরও নির্ভুল চিত্র পাওয়া যাবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সঠিক তথ্য একটি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ভিত্তি। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য এবং উৎপাদন সংক্রান্ত তথ্য যত নির্ভরযোগ্য হবে, নীতিনির্ধারণও তত কার্যকর হবে। ফলে তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে দেশের পরিসংখ্যান ও তথ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে। তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি উন্নত করার পাশাপাশি তথ্য বিশ্লেষণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রেও নির্ভরযোগ্য তথ্য অপরিহার্য। বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকের অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য তথ্যভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ক্লাউডভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে সরকারি তথ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হতে পারে। তবে এর সঙ্গে তথ্য সুরক্ষা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়েও যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের জন্য শুধু তথ্য সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়; সেই তথ্যকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ এবং ব্যবহার করাও জরুরি। তথ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা গেলে সরকারি সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয় কমবে, সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং নাগরিক সেবার মান উন্নত হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থাও বৃদ্ধি পাবে।
সব মিলিয়ে, তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ, নির্ভুল এবং আধুনিক করতে সরকারের উদ্যোগ দেশের প্রশাসনিক দক্ষতা ও উন্নয়ন কার্যক্রমকে নতুন মাত্রা দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তথ্যভিত্তিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার এই প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।