নেইমারের প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে উড়িয়ে দিল ব্রাজিল

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬
  • ৪২ বার

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিল যখন মাঠে নামে, তখন প্রত্যাশার মাত্রা এমনিতেই আকাশছোঁয়া থাকে। আর সেই ম্যাচে যদি দীর্ঘদিন পর জাতীয় দলের জার্সিতে ফেরেন নেইমার জুনিয়রের মতো একজন কিংবদন্তি ফুটবলার, তাহলে আবেগ, উত্তেজনা এবং প্রত্যাশা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের ম্যাচটি ছিল ঠিক তেমনই এক বিশেষ উপলক্ষ। নেইমারের বহুল প্রতীক্ষিত প্রত্যাবর্তনের রাতে দুর্দান্ত এক জয় উপহার দিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের জোড়া গোল এবং ম্যাথিউস কুনহার আরেক গোলের সুবাদে স্কটল্যান্ডকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে সেলেসাওরা।

যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচের শুরু থেকেই নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ব্রাজিল। বলের নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের গতি এবং পাসিং ফুটবলে প্রতিপক্ষকে শুরু থেকেই চাপে রাখে কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা। ম্যাচের সপ্তম মিনিটেই সেই চাপের ফল পেয়ে যায় তারা।

স্কটল্যান্ডের রক্ষণভাগের ভুলকে কাজে লাগিয়ে ব্রাজিলের হয়ে প্রথম গোলটি করেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। সেন্টার-ব্যাক স্কট ম্যাককেনার একটি ভুল পাসের সুযোগ নিয়ে দ্রুত বলের নিয়ন্ত্রণ নেন এই ব্রাজিলিয়ান তারকা। এরপর গোলরক্ষক অ্যাঙ্গাস গুনকে কাটিয়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়ান তিনি। ম্যাচের শুরুতেই এমন গোল স্কটল্যান্ডকে মানসিকভাবে পিছিয়ে দেয় এবং ব্রাজিলকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

প্রথম গোলের পরও আক্রমণের ধার কমায়নি ব্রাজিল। বরং একের পর এক আক্রমণে স্কটিশ রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রাখে তারা। ভিনিসিয়ুস, রদ্রিগো, ব্রুনো গুইমারেস এবং কুনহার সমন্বিত আক্রমণ বারবার বিপদ তৈরি করছিল। যদিও বেশ কিছু সুযোগ নষ্ট হওয়ার কারণে ব্যবধান দীর্ঘ সময় এক গোলেই সীমাবদ্ধ ছিল।

তবে প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে আসে দ্বিতীয় গোল। যোগ করা সময়ে ব্রুনো গুইমারেসের দারুণ একটি ক্রস থেকে অসাধারণ হেডে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। স্কটল্যান্ডের রক্ষণভাগকে ফাঁকি দিয়ে করা এই গোলটি শুধু ব্রাজিলের লিডই বাড়ায়নি, বরং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তাদের হাতে তুলে দেয়। ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় দক্ষিণ আমেরিকার জায়ান্টরা।

দ্বিতীয়ার্ধে স্কটল্যান্ড ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। ম্যাচে ফেরার জন্য তারা আক্রমণের গতি বাড়ায় এবং কয়েকটি ভালো সুযোগও তৈরি করে। বিশেষ করে মিডফিল্ডার স্কট ম্যাকটোমিনে কয়েকবার ব্রাজিলের রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু প্রতিবারই সামনে দাঁড়িয়ে যান ব্রাজিল গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার।

লিভারপুলের এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ম্যাচজুড়ে অসাধারণ কিছু সেভ করেন। স্কটল্যান্ডের একাধিক নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করে দিয়ে তিনি প্রমাণ করেন কেন তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক বলা হয়। তাঁর দৃঢ় উপস্থিতি স্কটল্যান্ডের খেলোয়াড়দের হতাশ করে তোলে এবং ম্যাচে ফেরার সব সম্ভাবনা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়।

স্কটল্যান্ড যখন ম্যাচে ফেরার পথ খুঁজছিল, তখন ৬০তম মিনিটে শেষ আঘাত হানে ব্রাজিল। ব্রুনো গুইমারেসের চমৎকার পাস থেকে বল পেয়ে দারুণ ফিনিশিংয়ে গোল করেন ম্যাথিউস কুনহা। এই গোলের মাধ্যমে ব্যবধান দাঁড়ায় ৩-০। আগের ম্যাচে হাইতির বিপক্ষে জোড়া গোল করা কুনহার জন্য এটি ছিল চলতি বিশ্বকাপে তৃতীয় গোল।

গোল উদযাপনের সময় কুনহার আচরণ বিশেষভাবে নজর কাড়ে। বেঞ্চে বসে থাকা নেইমারের দিকে ছুটে গিয়ে তাঁর সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন তিনি। এটি ছিল ব্রাজিল দলের ভেতরের ঐক্য এবং সিনিয়র-জুনিয়র খেলোয়াড়দের পারস্পরিক শ্রদ্ধার একটি সুন্দর প্রতিচ্ছবি।

তবে ম্যাচটির সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে ৭৫তম মিনিটে। ম্যাথিউস কুনহার পরিবর্তে মাঠে নামেন নেইমার জুনিয়র। স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো দর্শক তখন দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে তাঁকে স্বাগত জানান। প্রায় তিন বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর প্রত্যাবর্তন ছিল ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য বিশেষ আনন্দের উপলক্ষ।

২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচ খেলেছিলেন নেইমার। এরপর গুরুতর ইনজুরি এবং দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার কারণে মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাঁকে। তাই তাঁর ফিরে আসার মুহূর্তটি শুধু একজন ফুটবলারের প্রত্যাবর্তন নয়, বরং ধৈর্য, সংগ্রাম এবং আত্মবিশ্বাসের এক অনন্য গল্প।

ম্যাচের বাকি সময়ে ব্রাজিল আরও কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও ব্যবধান আর বাড়াতে পারেনি। তবে ৩-০ গোলের জয় নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় কার্লো আনচেলত্তির দলকে। পুরো ম্যাচজুড়ে তাদের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। পরিসংখ্যানও সেই চিত্রই তুলে ধরে। ব্রাজিল ম্যাচে মোট ২১টি শট নেয়, যার মধ্যে ৮টি ছিল লক্ষ্যে। অন্যদিকে স্কটল্যান্ড ৯টি শটের মধ্যে ৫টি অন-টার্গেট রাখতে সক্ষম হলেও অ্যালিসনের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে গোলের দেখা পায়নি।

এই জয়ের ফলে তিন ম্যাচে সাত পয়েন্ট সংগ্রহ করে ‘সি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে ব্রাজিল। গ্রুপ পর্বে তাদের পারফরম্যান্স শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে তিন পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে থেকে বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়েছে স্কটল্যান্ডের।

বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখন সামনে। আর ঠিক সেই সময়েই নেইমারের ফিরে আসা ব্রাজিলের জন্য বাড়তি আত্মবিশ্বাসের উৎস হয়ে উঠেছে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুর্দান্ত ফর্ম, কুনহার ধারাবাহিক গোল এবং অ্যালিসনের নির্ভরযোগ্য পারফরম্যান্সের সঙ্গে নেইমারের অভিজ্ঞতা যোগ হলে ব্রাজিলকে থামানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

মায়ামির রাতটি তাই শুধু একটি জয়ের গল্প নয়। এটি ছিল ব্রাজিলের শক্তিমত্তার প্রদর্শন, ভিনিসিয়ুসের উজ্জ্বল নৈপুণ্য এবং সর্বোপরি নেইমারের আবেগঘন প্রত্যাবর্তনের এক স্মরণীয় অধ্যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com