সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকারের প্রয়াণে শোকের ছায়া

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬
  • ৩১ বার

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের রাজনীতি, সংসদীয় গণতন্ত্র এবং আইন অঙ্গনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই। রোববার (১২ জুলাই) ভোর ৪টা ১৯ মিনিটে রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।

বিএনপির নেতা ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা এবং দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি কয়েক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী, আইনজীবী সমাজ এবং সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে গভীর শোকের আবহ সৃষ্টি হয়েছে।

মৃত্যুর আগের দিন শনিবার রাতে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল হাসপাতালে গিয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। এ সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তিনি চিকিৎসকদের কাছ থেকেও সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হন। তবে রাত পেরোতেই দেশ হারায় একজন অভিজ্ঞ সংসদ নেতা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনীতিককে।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জন্ম ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে। শৈশব থেকেই তিনি মেধাবী ও অধ্যবসায়ী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পর আইন বিষয়ে আরও উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে যান। লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করে দেশে ফিরে ১৯৬০ সালে আইন পেশায় যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

আইন পেশার পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন এবং দীর্ঘদিন দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দলের সংকটময় সময়গুলোতেও তিনি শান্ত, বিচক্ষণ এবং অভিজ্ঞ নেতৃত্বের জন্য পরিচিত ছিলেন। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও ব্যক্তিগত সৌজন্য ও শালীন আচরণের কারণে তিনি বিভিন্ন দলের নেতাদের কাছেও সম্মানিত ছিলেন।

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর তিনি অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। সংসদের কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি সাংবিধানিক বিধান, সংসদীয় রীতি এবং নিরপেক্ষতার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেন। রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত সময়েও সংসদ পরিচালনায় তাঁর অভিজ্ঞতা ও ধৈর্য প্রশংসিত হয়েছিল।

তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন। রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করার পর সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সীমিত সময়ের সেই দায়িত্বও তিনি দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পালন করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার স্বাক্ষর রাখেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার সংসদীয় গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার পক্ষে ধারাবাহিকভাবে ভূমিকা রেখেছেন। আইনজীবী হিসেবে তাঁর যুক্তি, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁর প্রজ্ঞা এবং স্পিকার হিসেবে তাঁর দায়িত্বশীলতা তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বতন্ত্র অবস্থান এনে দিয়েছে। অনেক তরুণ আইনজীবী ও রাজনীতিক তাঁর কর্মজীবনকে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন।

তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্য, আইনজীবী সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। শোকবার্তায় তাঁরা মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন এমন একজন রাজনীতিক, যিনি দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেও ব্যক্তিগত সততা, সংযম এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার ধরে রেখেছিলেন।

জাতীয় সংসদের বর্তমান স্পিকারও পৃথক শোকবার্তায় তাঁর মৃত্যুতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের অবদান বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জানাজা ও দাফনের সময়সূচি পরে ঘোষণা করা হবে। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং সাধারণ মানুষকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ রেখে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে। প্রায় এক শতাব্দীর দীর্ঘ জীবনে আইন, রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে রেখে যাওয়া তাঁর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করা হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com