শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন কতটা বাস্তবসম্মত?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
  • ১ বার
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন কতটা বাস্তবসম্মত?

প্রকাশ: ১৩ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের মাটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে তৈরি হয়েছে এক রহস্যময় ধোঁয়াশা। গত শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের কাছে এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, আগামী ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। অথচ তার এই ঘোষণা রাজনৈতিক অঙ্গনে কোনো আশার আলো নয়, বরং এক তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বক্তব্য কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং একে নিছক ‘রাজনৈতিক স্টান্টবাজি’ হিসেবেই দেখছেন তারা। এর আগে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া অডিও কলরেকর্ডগুলোতেও তার দেশে ফেরার একই সুর শোনা গিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত কেবল কথার আড়ালেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

শেখ হাসিনার এই ঘোষণা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর পেছনে কোনো বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক ভিত্তি নেই। জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই তিনি বিভিন্ন সময় দেশে ফেরার কথা বলে আসছেন। কিন্তু অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারীর মতো প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, তার এই বক্তব্যের কোনো নির্ভরযোগ্যতা নেই। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কোন ডিসেম্বরের কথা বলা হচ্ছে? ২০২৬ সাল নাকি তার পরের কোনো বছর? বিএনপি যেমন অতীতে ‘ঈদের পরে আন্দোলনের’ ডাক দিয়ে দীর্ঘ সময় পার করেছে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রতিশ্রুতি অনেকটা সে রকমই এক নিষ্ফলা কৌশলে পরিণত হয়েছে। এটি মূলত দলের হতাশ ও ছত্রভঙ্গ কর্মীদের মধ্যে সাময়িক সাহস সঞ্চার করার একটি মরিয়া প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় শেখ হাসিনার দেশে ফেরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। তিনি দেশে পা রাখলে কেবল আইনি কাঠগড়াতেই তাকে দাঁড়াতে হবে না, বরং প্রবল জনরোষের মুখে পড়ার সম্ভাবনাও প্রবল। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী সকল পক্ষই তার বিরুদ্ধে অভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। তিনি যদি ফিরেও আসেন, তবে জনমত তার পক্ষে আসবে এমন সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো এখন আর আওয়ামী লীগের সমর্থনে সক্রিয় নেই। ফলে শেখ হাসিনার এই ঘোষণা কেবল দলীয় কর্মীদের সান্ত্বনা দেওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবেই গণ্য হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের দলীয় চরিত্র ও রূপান্তর নিয়ে বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। দীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে দলটির ভেতরে ভোগবাদী মানসিকতা শেকড় গেড়েছে। দলের তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতারাই দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। যারা নিজেদের জীবনকে বিদেশের মাটিতে সুরক্ষিত ও বিলাসিতায় মোড়াতে সক্ষম হয়েছেন, তারা এখন আর বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে এসে ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নন। অধ্যাপক ড. নুরুল আমিনের ভাষায়, যারা প্রচুর টাকার মালিক হয়েছেন, তারা আর আন্দোলনমুখী হতে পারেন না। তারা তাদের বিলাসিতার জীবন ছেড়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে পা বাড়াবেন, এমনটা আশা করা বাতুলতা। বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে যে সাংগঠনিক সংহতি প্রয়োজন, তা দৃশ্যত অনুপস্থিত।

অন্যদিকে, ভূ-রাজনীতির সমীকরণও এখন আর আগের মতো নেই। ভারত সরকার দীর্ঘ মেয়াদে শেখ হাসিনাকে নিজেদের জন্য এক ধরনের বোঝা মনে করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ বর্তমান সরকারের চীনমুখী কূটনীতি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক নতুন প্রকল্পগুলোর দিকে ঝুঁকছে, যা ভারতের দীর্ঘদিনের প্রভাব বলয়কে কিছুটা শিথিল করেছে। ফলে ভারতও শেখ হাসিনাকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে নতুন করে চিন্তাভাবনা করছে। এমন এক পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঝুঁকি নেওয়া বা ভারত কর্তৃক সেই ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া বেশ জটিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত হয়তো খুব শীঘ্রই শেখ হাসিনাকে নিয়ে তাদের কৌশল পরিবর্তন করবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলামের মতে, আইনের মুখোমুখি হওয়ার ভয় থেকেই শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছিলেন। তিনি মনে করেন, যদি তিনি সত্যি আত্মসমর্পণ করতে চাইতেন, তবে অনেক আগেই তার পথ তৈরি ছিল। মূলত জনসমর্থন হারিয়ে ফেলা একটি দলের কর্মীদের মনে পুনরায় মিথ্যে আশা জাগিয়ে রাখা এবং নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার জন্য এই ধরনের রাজনৈতিক চাল চালছেন তিনি। আইনুল ইসলামের কথায়, এটি এক ধরনের স্টান্টবাজি যা কেবল রাজনীতির মাঠে আলোচনার খোরাক জোগায়, কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনো সংযোগ নেই।

পরিশেষে বলা যায়, শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার এই প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক মহলে কেবল সংশয়ের দোলাচলই তৈরি করেছে। দেশের মানুষ এখন একটি নতুন ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। বিগত বছরগুলোতে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানুষ রাজপথে নেমেছিল, তা এখনো তাদের মানসপটে অটুট। সুতরাং, দেশে ফেরার এই গুঞ্জন আর যাই হোক, পুনরায় কোনো বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির সক্ষমতা রাখে না। ক্ষমতাচ্যুত নেত্রীর এই নাটকীয় বক্তব্য রাজনৈতিক ময়দানে এক ধরনের তামাশায় পরিণত হয়েছে, যা সাধারণ জনগণের মধ্যে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারছে না। শেখ হাসিনার এই অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখা এখন আর দেশের সচেতন নাগরিকদের পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ তারা জানেন যে, ক্ষমতার পালাবদলের এই জটিল খেলায় ফিরে আসার ঝুঁকি নেওয়ার মতো সাহসিকতা কেবল কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত