আট বছর পর কাঠমান্ডু রুটে ফিরছে ইউএস-বাংলা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
আট বছর পর কাঠমান্ডু রুটে ফিরছে ইউএস-বাংলা

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রায় আট বছরের দীর্ঘ বিরতির পর আবারও ঢাকা-কাঠমান্ডু রুটে নির্ধারিত ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে দেশের অন্যতম বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে এই আন্তর্জাতিক রুটে পুনরায় যাত্রীসেবা চালুর পরিকল্পনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে চার দিন ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ইউএস-বাংলার এই প্রত্যাবর্তনের ফলে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যকার আকাশপথে প্রতিযোগিতা বাড়বে, যাত্রীদের জন্য ভ্রমণ আরও সহজ হবে এবং ভাড়ায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম সোমবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঢাকা-কাঠমান্ডু রুটে পুনরায় ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আনুষ্ঠানিক সময়সূচি, টিকিট বিক্রি এবং উদ্বোধনের তারিখ খুব শিগগিরই ঘোষণা করা হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং যাত্রীদের সর্বোচ্চ মানের সেবা নিশ্চিত করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকা থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে সপ্তাহে চারটি নির্ধারিত ফ্লাইট পরিচালিত হবে। এই রুটে ব্যবহার করা হবে বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ, যা মধ্যম দূরত্বের আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী পরিবহনের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং নির্ভরযোগ্য হিসেবে পরিচিত। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এই উড়োজাহাজ ব্যবহারের মাধ্যমে যাত্রীদের আরও আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে সংস্থাটির।

বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটন, ব্যবসা, শিক্ষা এবং ধর্মীয় ভ্রমণের জন্য যাত্রী চলাচল উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে হিমালয় অঞ্চলে ভ্রমণ, ট্রেকিং, পর্বতারোহণ, বৌদ্ধ ধর্মীয় তীর্থস্থান পরিদর্শন এবং ব্যবসায়িক সফরের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক নেপাল সফর করেন। একইভাবে নেপাল থেকেও পর্যটক ও ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে আসেন। ফলে এই রুটে নতুন করে ইউএস-বাংলার ফ্লাইট চালু হলে দুই দেশের মানুষের যাতায়াত আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিমান পরিবহন খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ঢাকা-কাঠমান্ডু রুটে সীমিতসংখ্যক এয়ারলাইন্স সেবা দিচ্ছে। ইউএস-বাংলার প্রত্যাবর্তনের ফলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বিমান ভাড়ার ওপর। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে যাত্রীদের জন্য আরও সুবিধাজনক সময়সূচি, উন্নত সেবা এবং তুলনামূলক কম ভাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ভ্রমণকারীদের জন্য বিকল্প ফ্লাইট বেছে নেওয়ার সুযোগও বাড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক রুটে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি শুধু যাত্রীদেরই উপকার করে না, বরং পুরো বিমান পরিবহন শিল্পের সেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যাত্রী আকৃষ্ট করতে এয়ারলাইন্সগুলোকে সময়নিষ্ঠা, নিরাপত্তা, সেবার গুণগত মান এবং প্রযুক্তিনির্ভর সুবিধা বাড়াতে হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি লাভবান হন যাত্রীরাই।

ইউএস-বাংলার জন্য ঢাকা-কাঠমান্ডু রুটটি শুধু একটি বাণিজ্যিক রুট নয়, বরং আবেগ এবং ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে। ২০১৮ সালের ১২ মার্চ কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিএস-২১১ ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়। ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া বোম্বার্ডিয়ার ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ উড়োজাহাজটি রানওয়ের কাছে বিধ্বস্ত হলে চারজন ক্রুসহ মোট ৭১ আরোহীর মধ্যে ৫১ জন নিহত হন। বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাসে এটি অন্যতম ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

সেই দুর্ঘটনা শুধু বহু পরিবারের জীবনে গভীর শোকের ছাপ ফেলেনি, বরং ইউএস-বাংলার আন্তর্জাতিক কার্যক্রমেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা, তদন্ত এবং বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার কারণে সংস্থাটি ঢাকা-কাঠমান্ডু রুটে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রাখে। দীর্ঘ আট বছর পর সেই রুটে আবারও যাত্রীসেবা চালুর উদ্যোগকে প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অতীতের দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড আরও কঠোরভাবে অনুসরণ করা এখন প্রতিটি এয়ারলাইন্সের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাত্রীদের আস্থা ধরে রাখতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন, ক্রুদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে পরিচালনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ইউএস-বাংলার নতুন উদ্যোগেও এসব বিষয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করা, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নতুন গন্তব্য চালুর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। ঢাকা-কাঠমান্ডু রুট পুনরায় চালু হওয়ার মাধ্যমে সেই সম্প্রসারণ পরিকল্পনা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পর্যটন খাতের উদ্যোক্তাদের মতে, বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ জোরদার হলে দুই দেশের পর্যটন শিল্প আরও লাভবান হবে। নেপালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, হিমালয়ভিত্তিক পর্যটন এবং ধর্মীয় দর্শনীয় স্থানগুলো বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে বরাবরই জনপ্রিয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের সমুদ্রসৈকত, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও নেপালের পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে। ফলে নিয়মিত ও প্রতিযোগিতামূলক বিমান যোগাযোগ দুই দেশের পর্যটন খাতের জন্য ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনতে পারে।

ব্যবসায়ীরাও মনে করছেন, সরাসরি ফ্লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে বাণিজ্যিক যোগাযোগ সহজ হবে। সময় সাশ্রয়, নির্ভরযোগ্য যাতায়াত এবং উন্নত সংযোগের মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের এই সিদ্ধান্তকে তাই শুধু একটি নতুন ফ্লাইট চালুর ঘোষণা হিসেবে নয়, বরং অতীতের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায় অতিক্রম করে নতুন আস্থা ও সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এখন আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এবং ফ্লাইট পরিচালনা শুরুর অপেক্ষায় রয়েছেন পর্যটক, ব্যবসায়ী এবং নিয়মিত ভ্রমণকারীরা। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, নিরাপদ, সময়নিষ্ঠ এবং মানসম্পন্ন সেবার মাধ্যমে ইউএস-বাংলা আবারও ঢাকা-কাঠমান্ডু আকাশপথে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত