প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা, ‘জুরাসিক পার্ক’ চলচ্চিত্রে ড. অ্যালান গ্রান্ট চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে কোটি দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া নিউজিল্যান্ডের কিংবদন্তি অভিনেতা স্যাম নিল আর নেই। পরিবার জানিয়েছে, সোমবার (১৩ জুলাই) অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। পরিবার তাঁর মৃত্যু ‘আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত’ বলে উল্লেখ করেছে এবং জানিয়েছে, মৃত্যুর সময় তিনি ক্যান্সারমুক্ত ছিলেন।
পরিবারের দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ের মতোই স্যাম নিল অত্যন্ত মর্যাদা ও শান্তভাবে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছেন। তাঁর শেষ মুহূর্তগুলো পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই কেটেছে। একই সঙ্গে পরিবার সিডনির সেন্ট ভিনসেন্ট’স প্রাইভেট হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স এবং কর্মীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি শোকের এই কঠিন সময়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার জন্য গণমাধ্যম ও ভক্তদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে।
স্যাম নিলের মৃত্যু বিশ্ব চলচ্চিত্রাঙ্গনের জন্য একটি বড় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময়জুড়ে তিনি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে অসাধারণ অভিনয়শৈলীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর অভিনয়জীবনে ১৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি নিজেকে সমসাময়িক সময়ের অন্যতম বহুমাত্রিক অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
যদিও বিশ্বজুড়ে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত ‘জুরাসিক পার্ক’ চলচ্চিত্রে ড. অ্যালান গ্রান্ট চরিত্রের জন্য, তাঁর অভিনয়জীবন কেবল এই একটি চরিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ‘দ্য পিয়ানো’, ‘দ্য হান্ট ফর রেড অক্টোবর’, ‘ইভেন্ট হরাইজন’, ‘হান্ট ফর দ্য উইল্ডারপিপল’ এবং জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’-এ তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের সমানভাবে মুগ্ধ করেছে। চরিত্রের গভীরতা, সংযত অভিনয় এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব তাঁকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম সম্মানিত অভিনেতায় পরিণত করেছিল।
২০২৩ সালে স্যাম নিল নিজেই প্রকাশ করেছিলেন যে তিনি বিরল ধরনের নন-হজকিন লিম্ফোমায় আক্রান্ত হয়েছেন। পরে প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি অত্যাধুনিক কার-টি (CAR-T) সেল থেরাপি গ্রহণ করেন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর চলতি বছরের এপ্রিলে তিনি আনন্দের সঙ্গে জানান, তাঁর শরীরে আর ক্যান্সারের কোনো অস্তিত্ব নেই। চিকিৎসার সফলতা নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন এবং জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার কথাও বলেছিলেন। তাঁর পরিবারও নিশ্চিত করেছে, মৃত্যুর সময় তিনি ক্যান্সারমুক্ত ছিলেন এবং তাঁর মৃত্যু ক্যান্সারের পুনরাবৃত্তির কারণে হয়নি।
স্যাম নিল ১৯৪৭ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করলেও শৈশবে পরিবারের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডে চলে যান। সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা এবং অভিনয়জীবনের সূচনা। ১৯৭০-এর দশকে চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। হলিউড, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড—তিন দেশের চলচ্চিত্র শিল্পেই তিনি সমানভাবে সম্মানিত ছিলেন।
চলচ্চিত্রের বাইরে তিনি ছিলেন একজন লেখক, কৃষক এবং ওয়াইনারির মালিক। নিউজিল্যান্ডের সেন্ট্রাল ওটাগো অঞ্চলে তাঁর ‘টু প্যাডকস’ আঙুরবাগান ও ওয়াইনারি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অন্যতম প্রিয় জায়গা। ব্যস্ত অভিনয়জীবনের ফাঁকে তিনি প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে ভালোবাসতেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই নিজের খামার, প্রাণী এবং দৈনন্দিন জীবনের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করতেন। তাঁর রসবোধ এবং সহজ-সরল জীবনযাপন তাঁকে ভক্তদের কাছে আরও প্রিয় করে তুলেছিল।
স্যাম নিলের মৃত্যুর পরপরই বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা, সহশিল্পী এবং ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এবং নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন তাঁকে নিজ নিজ দেশের চলচ্চিত্র ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতিনিধি হিসেবে অভিহিত করে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করেছেন।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, স্যাম নিল এমন একজন অভিনেতা ছিলেন যিনি বাণিজ্যিক ব্লকবাস্টার থেকে শুরু করে শিল্পমানসম্পন্ন চলচ্চিত্র—সব ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনয়ের বৈচিত্র্য, সংযম এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতা তাঁকে সমসাময়িক অনেক অভিনেতার চেয়ে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
স্যাম নিলের প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বিশ্ব চলচ্চিত্র এক অনন্য প্রতিভাকে হারাল। তাঁর অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র, মানবিক ব্যক্তিত্ব এবং অভিনয়জীবনের অসাধারণ সাফল্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পী ও দর্শকদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তাঁর রেখে যাওয়া চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনকর্ম বিশ্ব সংস্কৃতির অংশ হিসেবেই দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।