প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাতের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সমরাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ায় ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষে ব্যাপকহারে ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার হামলার অস্ত্র ব্যবহার করায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডার আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে উঠে এসেছে। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান গতিতে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ভবিষ্যতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীন কিংবা কোরীয় উপদ্বীপে কোনো বড় ধরনের সংঘাত দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা নতুন মাত্রা পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দেওয়ার পর উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা আরও তীব্র হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির সামরিক পরিকল্পনার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম ধাপে পরিচালিত মার্কিন অভিযানে কয়েক হাজার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এই ব্যাপক সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে পেন্টাগনকে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক কানসিয়ান সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান গতিতে সামরিক অভিযান চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নতুন কৌশলগত ঝুঁকির সৃষ্টি করবে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা কেবল মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে নয়; বরং একই সময়ে বিশ্বের একাধিক অঞ্চলে সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা ধরে রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিএসআইএসের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের অন্তত অর্ধেক থাড (THAAD) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছে। একই সঙ্গে প্রায় অর্ধেক প্যাট্রিয়ট (Patriot) আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ৩০ শতাংশ টমাহক (Tomahawk) ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার হয়ে গেছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এই তিন ধরনের অস্ত্রই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কৌশলের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি গবেষক মাইকেল ও’হ্যানলনের মতে, অস্ত্রের মজুত প্রত্যাশার তুলনায় অনেক দ্রুত কমে গেছে। তাঁর ভাষায়, এই বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত অব্যাহত থাকলে সেই সক্ষমতার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে অস্ত্রের উৎপাদন সক্ষমতা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রতি মাসে গড়ে মাত্র ১৫টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ২০টি নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করতে পারছে। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের মধ্যে নতুন থাড ইন্টারসেপ্টর হাতে পাওয়ার সম্ভাবনাও খুবই সীমিত। ফলে যুদ্ধকালীন ব্যবহারের তুলনায় উৎপাদনের গতি অনেক ধীর হওয়ায় অস্ত্রভাণ্ডার পুনর্গঠনে দীর্ঘ সময় লাগবে।
মার্ক কানসিয়ানের মতে, যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থানে ফিরতে কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগতে পারে। সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা এলেন ম্যাককাসকারও একই ধরনের মূল্যায়ন দিয়েছেন। তাঁর মতে, অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সমরাস্ত্রের মজুত পুনরুদ্ধারে দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে, যদি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন না আনা হয়।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় বিশেষজ্ঞ জন ফেরারি বলেছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের জন্য কংগ্রেস থেকে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ এখনো অনুমোদিত হয়নি। ফলে শান্তিকালীন উৎপাদন কাঠামোই কার্যকর রয়েছে, যা যুদ্ধকালীন চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও শিল্প সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া অস্ত্র সংকট কাটানো কঠিন হবে।
এদিকে হোয়াইট হাউস যুদ্ধ পরিচালনা এবং অস্ত্র পুনরায় উৎপাদনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ চেয়ে কংগ্রেসের কাছে আবেদন করেছে। তবে রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে এই প্রস্তাব সহজে অনুমোদন পাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিরক্ষা শিল্পকে দ্রুত সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্টের আওতায় নতুন উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের উৎপাদন বাড়ানো।
পেন্টাগনের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ দেশের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও শিল্প সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। সরবরাহ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার জন্য বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ও জোরদার করা হয়েছে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই উদ্যোগ কার্যকর হলেও তার সুফল পেতে সময় লাগবে এবং তাৎক্ষণিক সংকট পুরোপুরি কাটবে না।
বিশ্বব্যাপী অস্ত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এখন মিত্র দেশগুলোর অংশগ্রহণও বাড়াতে চাইছে। সম্প্রতি ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে ইউক্রেনসহ কয়েকটি দেশকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে বহু বছর সময় লাগে। উদাহরণ হিসেবে জাপানের একটি প্যাট্রিয়ট কারখানা নির্মাণে প্রায় তিন বছর সময় লেগেছে। আবার জার্মানি কয়েক বছর আগে প্রকল্প শুরু করলেও এখনো পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যেতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি এবং উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চলতে থাকলে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংঘাতে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে বলেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এখনো যুক্তরাষ্ট্রেরই রয়েছে। তাঁর দাবি, প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী বিশ্বের যেকোনো স্থানে অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও অস্ত্রভাণ্ডার এখনো মার্কিন বাহিনীর হাতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ, মিত্র দেশ এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে মাইকেল ও’হ্যানলন মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতেও চীন কিংবা উত্তর কোরিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলা করার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সামরিক শক্তির একটি সীমা রয়েছে এবং অস্ত্রের মজুত নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে নেমে গেলে প্রতিপক্ষ সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে। তাঁর মতে, প্রতিরোধ ক্ষমতা কেবল অস্ত্রের সংখ্যার ওপর নয়, বরং প্রতিপক্ষের ধারণা ও কৌশলগত মূল্যায়নের ওপরও নির্ভর করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই প্রভাবিত করছে না; এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পরিকল্পনা, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং বৈশ্বিক কৌশলগত ভারসাম্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, অস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন অর্থায়ন এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা ওয়াশিংটনের জন্য তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।