প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতিগুলোতে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত এসব বসতিকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা দিয়েছে। ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অবৈধ বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাব্য উপায় এবং আইনি কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। যদিও তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে বিষয়টি ইউরোপীয় নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত বৈঠকের শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেন, পশ্চিম তীরের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং কার্যত অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁর ভাষায়, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে যে, অধিকৃত অঞ্চলে চলমান বসতি সম্প্রসারণ দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক শান্তি সমাধানের সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। তিনি জানান, এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সদস্য দেশগুলো সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলি বসতিকে কেন্দ্র করে মতপার্থক্য থাকলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে কয়েকটি দেশ আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। আয়ারল্যান্ড, স্পেন এবং নেদারল্যান্ডস ইতোমধ্যেই নিজেদের পর্যায়ে অবৈধ বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। এখন তারা চাইছে, পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়ন একই ধরনের সমন্বিত নীতি গ্রহণ করুক, যাতে সব সদস্য রাষ্ট্রে একই নিয়ম কার্যকর হয়।
এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে ইউরোপীয় কমিশন অবৈধ বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত বা সম্পূর্ণ বন্ধ করার কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সামনে উপস্থাপন করে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে অবৈধ বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক সুবিধা প্রত্যাহার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেন সীমিত করার মতো বিভিন্ন ব্যবস্থা।
বৈঠকে কাজা কালাস বলেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে এ বিষয়ে অসংখ্য অনুরোধ এসেছে। এখন দেখা হবে প্রস্তাবিত বিকল্পগুলোর প্রতি কতটা রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি ইঙ্গিত দেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সদস্য দেশগুলোর অবস্থান আরও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, সোমবারের বৈঠক থেকে কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা ছিল না। বরং এই বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতৈক্যের সম্ভাবনা যাচাই করা এবং ভবিষ্যতে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন গড়ে তোলা।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরেই বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। যারা দ্রুত পদক্ষেপ চায়, তারা আলোচনার ধীরগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কয়েকজন কূটনীতিক অভিযোগ করেছেন, ইউরোপীয় কমিশন বিষয়টি দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে ফেলছে এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে গড়িমসি করছে।
বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভোও এ প্রসঙ্গে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, বর্তমানে যে বিকল্পগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবসম্মত সমাধানের চেয়ে সময়ক্ষেপণের কৌশল বলেই বেশি মনে হচ্ছে। তিনি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এদিকে প্রস্তাবটি কার্যকর করতে হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা চলছে। প্রশ্ন উঠেছে, এমন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের সর্বসম্মতি প্রয়োজন হবে, নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। এই আইনি ব্যাখ্যা নিয়েও ব্রাসেলসে মতপার্থক্য রয়েছে।
কূটনৈতিক মহলের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই সদস্য জার্মানি ও ইতালি এখনও এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পুরোপুরি স্পষ্ট করেনি। তাদের চূড়ান্ত অবস্থান অনেকটাই নির্ধারণ করবে প্রস্তাবটির ভবিষ্যৎ। কারণ এই দুই দেশের সমর্থন ছাড়া ইউরোপীয় পর্যায়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ রাজনৈতিকভাবে আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর অঞ্চল ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েলের দখলে রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের একাধিক প্রস্তাব অনুযায়ী, অধিকৃত এই ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন অবৈধ হিসেবে বিবেচিত। তবে ইসরায়েল এ অবস্থানের সঙ্গে একমত নয় এবং বিভিন্ন সময় বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রেখেছে।
বর্তমানে পূর্ব জেরুজালেম বাদে পশ্চিম তীরে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির পাশাপাশি ৫ লাখেরও বেশি ইসরায়েলি বসবাস করছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ মনে করে, এসব বসতি সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে আরও সংকুচিত করছে এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্মিলিতভাবে অবৈধ বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে সেটি ইসরায়েলের ওপর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থানকে আরও সুস্পষ্ট করবে। তবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে আরও সময় লাগতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই আলোচনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু বাণিজ্যিক নীতির বিষয় নয়; বরং এটি ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটের রাজনৈতিক সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ইউরোপের অবস্থানকেও প্রতিফলিত করবে।