প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর গুলশান থানায় দায়ের করা একটি হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনের মামলায় ক্যাসিনো-কাণ্ডে আলোচিত ব্যবসায়ী সেলিম প্রধানকে আবারও গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর গুলশান-ভাটারা এলাকায় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে নতুন করে তদন্তে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে তদন্ত সংস্থা। আদালত রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের শুনানি শেষে তদন্তের স্বার্থে তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন এবং জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
সোমবার (১৩ জুলাই) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহ এ আদেশ দেন। আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সেলিম প্রধানকে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, মামলার তদন্তে তার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে, যা নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তাকে এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এই আবেদনের বিরোধিতা করে গ্রেপ্তার দেখানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং জামিনের আবেদন করেন। তবে উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত তদন্ত কর্মকর্তার আবেদন গ্রহণ করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আদালত তদন্তের স্বার্থে সেলিম প্রধানকে সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পাশাপাশি তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে মামলার তদন্ত এখন আরও বিস্তৃত পরিসরে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ৫ আগস্ট রাজধানীর গুলশান থানাধীন নতুন বাজার বাঁশতলা এলাকায় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও নির্বিচারে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই ঘটনায় বহু মানুষ আহত হন। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন মো. তৌহিদ মিয়া। পরবর্তীতে তিনি বাদী হয়ে আদালতে একটি সিআর মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে ৮৮ জনের নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ থেকে ২০০ জনকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মামলাটি হত্যাচেষ্টা এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় রুজু করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পেছনে পরিকল্পিত সহিংসতার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং নতুন নতুন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তের পরিধিও বাড়ানো হচ্ছে।
তদন্ত কর্মকর্তার আদালতে দেওয়া আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেলিম প্রধান বিগত সরকারের সক্রিয় নেতা এবং বিভিন্ন কার্যক্রমে আর্থিক সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করেছেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে গুলশান ও ভাটারা এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, মারধর এবং মামলার বাদীর ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় তিনি প্রত্যক্ষভাবে উসকানি দিয়েছেন এবং আর্থিক সহায়তা করেছেন—এমন তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত করতে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো প্রয়োজন বলে আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়।
তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আদালতে অভিযোগের বিচারিক প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি এবং মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। আইন অনুযায়ী, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী প্রমাণিত হন না। আদালতের নির্দেশও মূলত তদন্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
সেলিম প্রধান দেশের আলোচিত ক্যাসিনো-বিরোধী অভিযানের সময় আলোচনায় আসেন। অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা, অর্থপাচার এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে এর আগে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখোমুখি হন। এরপর একাধিক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দীর্ঘ সময় কারাগারেও থাকতে হয়। বিভিন্ন সময় তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রমও আদালতে চলমান রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত এখন নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। তদন্ত সংস্থাগুলো বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে নতুন নতুন ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনছে। এসব মামলায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ, উসকানি, অর্থায়ন কিংবা পরিকল্পনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্তের স্বার্থে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার দেখানোর অর্থ এই নয় যে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। তদন্ত শেষে সংগৃহীত সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতেই আদালত পরবর্তী আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। ফলে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাই আইনের দৃষ্টিতে নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত থাকেন।
এদিকে মামলাটির পরবর্তী তদন্ত কার্যক্রমে নতুন তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ভূমিকা যাচাই করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলে আদালতে মামলার বিচারিক কার্যক্রম পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যাবে। ফলে সেলিম প্রধানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হয়, তা নির্ভর করবে তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের ওপর।