প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নে দীর্ঘ দুই দশক ধরে জলাবদ্ধতা এখন স্থানীয় মানুষের নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুম এলেই অন্তত ৫০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে, আর দুর্ভোগে পড়েন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। পানিতে তলিয়ে যায় বাড়িঘর, গ্রামীণ সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ এবং বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত কালভার্ট, ড্রেন ও পাইপলাইনের মুখ অবৈধভাবে দখল করে বসতবাড়ি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করায় স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যায় ভুগলেও এখনো কার্যকর কোনো স্থায়ী সমাধান বাস্তবায়িত হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নের জাহাঙ্গীরাবাদ, সিট জাহাঙ্গীরাবাদ, পাঁচগাছি, বিরাহিমপুর, মোজাফ্ফরপুর, আমোদপুর, সাহাপুর, নাইয়ার বাজার, একতাবাজার এবং নাসিরাবাদসহ বিস্তীর্ণ এলাকা হাঁটুপানিতে তলিয়ে রয়েছে। অনেক স্থানে বাড়ির উঠান ও বসতভিটায় পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাঙ্গীরাবাদ-একতাবাজার, একতাবাজার-ছান্দিয়াপুর এবং একতাবাজার-পদ্দহার সড়ক নির্মাণের সময় ভেলামারি ও বামনীর বিলের পানি নিষ্কাশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তিনটি কালভার্ট এবং একটি পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব কালভার্ট ও পাইপলাইনের মুখে অবৈধভাবে ঘরবাড়ি, দোকানপাট এবং অন্যান্য স্থাপনা গড়ে ওঠে। ফলে পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং বর্ষার সময় অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি আটকে গিয়ে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
এ জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষা ও কৃষি খাত। একতাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একতাবাজার নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং আলহেরা কিন্ডারগার্টেনসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থীকে কাদাপানি পেরিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে, আবার অনেকে ঝুঁকি এড়াতে স্কুলে যাওয়া বন্ধ রাখছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ছবিজল মিয়া বলেন, প্রতিবছর বর্ষা শুরু হলেই তাদের বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যায়। শিশুদের নিরাপদে স্কুলে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং পরিবারের সদস্যদের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার সমাধানের আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
আরেক বাসিন্দা মেহেদী হাসান বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে কৃষিজমিতে আমন ধানসহ মৌসুমি ফসল চাষ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এতে কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। একই ধরনের অভিযোগ করেন কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা এলাকা পরিদর্শন করে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুমন আহম্মেদ জানান, জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় এক হাজার ২০০ একর কৃষিজমি নিয়মিত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব জমিতে স্বাভাবিকভাবে ধান উৎপাদন সম্ভব হলে প্রতি মৌসুমে প্রায় আট কোটি টাকার ফসল উৎপাদন করা যেত। কিন্তু পানি নিষ্কাশনের সমস্যা থাকায় কৃষকরা বছরের পর বছর উৎপাদন ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। এতে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
জাহাঙ্গীরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে এ সমস্যা চললেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রতিটি নির্বাচনের আগে সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও নির্বাচনের পর তা আর বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায় না। ফলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী একই দুর্ভোগের মধ্যে আটকে আছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য সাদা মিয়া মনে করেন, শুধু অস্থায়ী ব্যবস্থা নিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তিনি বলেন, স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, পানি চলাচলের পথ থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, খাল পুনঃখনন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় প্রতিবছর একই দুর্ভোগ অব্যাহত থাকবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, ব্যক্তিমালিকানার জমি হলেও যদি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। তিনি জানান, প্রকৌশল অধিদপ্তরের কারিগরি বিশেষজ্ঞ দল সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা তৈরি করলে স্থায়ী সমাধানের পথ বের করা সম্ভব হবে।
রংপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলামও সমস্যাটির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে স্থায়ীভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তারা মনে করেন, পানি নিষ্কাশনের পথ দখলমুক্ত করা, অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে শুধু পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগই কমবে না, কৃষি উৎপাদন, শিক্ষা কার্যক্রম এবং এলাকার সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।