তথ্য চাইতেই সাংবাদিকের নামে জিডি, সিআইডি কর্মকর্তাকে ঘিরে বিতর্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৮ বার
তথ্য চাইতেই সাংবাদিকের নামে জিডি, সিআইডি কর্মকর্তাকে ঘিরে বিতর্ক

প্রকাশ: ২০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রংপুরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে তথ্য জানতে চাওয়াকে কেন্দ্র করে এক সাংবাদিকের নামে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সাংবাদিক নেতারা বিষয়টিকে তথ্য অধিকার ও সংবাদপেশার স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তথ্য জানতে চাওয়া কি জিডি করার কারণ হতে পারে?

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রংপুর সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার (পদাবনতিপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া ভাউচার ব্যবহার, সরকারি জ্বালানি তেল অপব্যবহার, অসদাচরণ এবং প্রশাসনিক অনিয়মের নানা অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন সিআইডির বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

সূত্রগুলোর দাবি, সরকারি গাড়ির নামে অতিরিক্ত জ্বালানি তেলের বিল দেখিয়ে নিয়মিত অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এমনকি অচল যানবাহনের নামেও জ্বালানি বরাদ্দ দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কিছু পুলিশ সদস্য ও অফিস সহকারীর মাধ্যমে বিভিন্ন মদের দোকান ও ভাটিখানা থেকে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এসব বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতেও বিভিন্ন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে সুমিত চৌধুরীর বিরুদ্ধে একাধিক বিভাগীয় অভিযোগ ওঠে। মদ্যপ অবস্থায় দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনার পর তাকে বিভিন্ন সময় বদলি, স্ট্যান্ড রিলিজ এবং পদাবনতির মতো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

এমন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে একজন সাংবাদিক তথ্য সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। পরে ওই সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করে একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই সাংবাদিক সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

রংপুর সিআইডি অফিসের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক আবুল হাসান কবির জানিয়েছেন, জিডিতে সাংবাদিককে সরাসরি কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। তার দাবি, বদলিকৃত এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথোপকথনের বিষয়টি উল্লেখ করতেই সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। তবে সাংবাদিকের নাম জড়ানো হয়েছে—এ বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন।

রংপুর সাংবাদিক সমাজের আহ্বায়ক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক লিয়াকত আলী বাদল বলেন, তথ্য সংগ্রহ করা একজন সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব। সে কারণে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে জিডি করা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।

রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সালেকুজ্জামান সালেক ও সাধারণ সম্পাদক সরকার মাজহার মান্নান এক যৌথ প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য চাওয়া আইনসম্মত ও স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। এ ধরনের ঘটনায় সাংবাদিকদের মধ্যে ভয়ভীতি তৈরি হতে পারে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা দ্রুত জিডি প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং তা না হলে বৃহত্তর কর্মসূচির ইঙ্গিত দেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা শাখার সেক্রেটারি অধ্যাপক ফখরুল আনাম বেনজু বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত সংস্থায় দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের তথ্য অনুসন্ধানের অধিকারকে সম্মান জানানো উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ঘটনার বিষয়ে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিককে কোনোভাবেই এ ঘটনায় জড়ানো উচিত হয়নি। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন বলেও জানান। অন্যদিকে সিআইডি সদর দপ্তরের প্রশাসন শাখার ডিআইজি মিয়া মাসুদ করিম বলেন, তথ্য জানতে চাওয়ায় কোনো সাংবাদিকের নামে জিডি করা সমর্থনযোগ্য নয়। বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন বলে জানিয়েছেন।

অন্যদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন সহকারী পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী। তিনি বলেন, তিনি কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন। তার দাবি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছেন। অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামনে তিনি বলেন, যারা এসব অভিযোগ করছেন তারা প্রতিষ্ঠানের শত্রু এবং তাদের চিহ্নিত করা হবে।

এদিকে গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের তথ্য অনুসন্ধানের অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পরিবর্তে তথ্য জানতে চাওয়া ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তারা বলছেন, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

ঘটনাটি এখন শুধু একজন সাংবাদিকের নামে জিডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং পুরো ঘটনার স্বচ্ছ সমাধান নিশ্চিত করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত