প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হাম উপসর্গে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক এবং অভিভাবকদের মধ্যে। সোমবার (২০ জুলাই) সকালে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের সবাই দেড় বছরের নিচের শিশু, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ মৃত্যুর পর চলতি বছরের শুরু থেকে সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৩ জনে। মারা যাওয়া তিন শিশু হলো তাসফিয়া, আব্দুল্লাহ ও তানভীর। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, তারা উচ্চ জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, শ্বাসকষ্ট এবং অন্যান্য জটিল উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, হাম উপসর্গ নিয়ে বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৬৫ জন রোগী। প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে চাপ। চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্তদের একটি বড় অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, যাদের অনেকেই নির্ধারিত সময়ে হামের টিকা গ্রহণ করেনি অথবা অপুষ্টিসহ অন্যান্য শারীরিক জটিলতায় ভুগছিল।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নতুন করে কোনো রোগী হামে আক্রান্ত হিসেবে নিশ্চিত না হলেও ৫৮ জন নতুন সন্দেহভাজন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এসব রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পর প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ৫৪৫ জন ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তবে মৃত্যুবরণ করা ১০৩ শিশুর মধ্যে মাত্র ৪ জনের ক্ষেত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি মৃত্যুগুলো হামের উপসর্গের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন হিসেবে নথিভুক্ত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো পরীক্ষা সম্ভব না হওয়া, গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসা এবং চিকিৎসা শুরুর আগেই অবস্থার অবনতি হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই রোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এটি খুব দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে যেসব শিশু এখনো পূর্ণ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসেনি কিংবা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের জন্য এই সংক্রমণ মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। হামের কারণে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মারাত্মক পানিশূন্যতা, মস্তিষ্কে প্রদাহসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হামের প্রাথমিক লক্ষণের মধ্যে রয়েছে উচ্চমাত্রার জ্বর, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, কাশি, সর্দি এবং কয়েকদিন পর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া। এসব উপসর্গ দেখা দিলে শিশুকে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা রাখারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে না পড়ে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী এবং আইসোলেশন ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে রোগতত্ত্ব ও নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনার পাশাপাশি তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদেরও পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের নির্ধারিত বয়সে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হলে গুরুতর সংক্রমণ এবং মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। পাশাপাশি শিশুর পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, শিশুদের নির্ধারিত সময়ের টিকা অবশ্যই সম্পন্ন করতে হবে এবং জ্বর বা শরীরে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিলে কোনো ধরনের অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একই সঙ্গে গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের পরিবর্তে সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অনুসরণ করারও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, সিলেটে চলমান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আক্রান্তের সংখ্যা কমিয়ে আনতে এবং নতুন সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালের পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও চিকিৎসাসেবা জোরদার করা হয়েছে, যাতে রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা পেতে পারেন।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। টিকাদান কর্মসূচির আওতা আরও সম্প্রসারণ, রোগ শনাক্তকরণে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি রোধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিবার, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।