প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে বাংলাদেশ সরকার। এ লক্ষ্যে ভারত সরকারের কাছে তার প্রত্যর্পণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দিল্লিতে পাঠানো চিঠির সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের অনুলিপিও সংযুক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সোমবার (২০ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক আইন, বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। সরকার আশা করছে, বিষয়টি ভারত সরকার আইনগত ও কূটনৈতিক কাঠামোর আলোকে বিবেচনা করবে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারত সরকারের উদ্দেশে পাঠানো চিঠিতে আসাদুজ্জামান খান কামালকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ কর্তৃক প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপিও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে মামলার বিচারিক ভিত্তি ও আদালতের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বিচারের রায় কার্যকর করতে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক যোগাযোগ একটি স্বাভাবিক ও স্বীকৃত প্রক্রিয়া। তবে প্রত্যর্পণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান চুক্তি, জাতীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আলোকে নিষ্পত্তি হয়ে থাকে। ফলে বাংলাদেশ সরকারের এই অনুরোধের পর ভারতের আনুষ্ঠানিক অবস্থান ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার দিকে এখন নজর রয়েছে।
মামলার পটভূমিতে জানা যায়, জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আসামি করা হয়। তদন্ত শেষে প্রসিকিউশন অভিযোগপত্র দাখিল করলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দীর্ঘ বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ বিভিন্ন সাক্ষ্য, নথিপত্র, ভিডিওচিত্র এবং অন্যান্য আলামত আদালতে উপস্থাপন করে। অপরদিকে, বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়।
দীর্ঘ শুনানি ও বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধেও আদালত রায় প্রদান করেন।
রায়ে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন কমান্ডের দায় নীতির আওতায় নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকাণ্ডের জন্য দায় বহন করেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবতাবিরোধী অপরাধসংক্রান্ত বিচারব্যবস্থায় এই নীতির অর্থ হলো, কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যদি অধস্তন বাহিনীর অপরাধ সম্পর্কে জানতেন বা জানার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা প্রতিরোধ কিংবা শাস্তির ব্যবস্থা না করেন, তাহলে তিনিও আইনের দৃষ্টিতে দায়ী হতে পারেন। ট্রাইব্যুনাল তাদের রায়ে এই নীতির প্রয়োগের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন।
পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনাল ৪৫৩ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে। ওই রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের রাষ্ট্রীয় অনুকূলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশও দেওয়া হয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে মামলার বিভিন্ন তথ্য, সাক্ষ্য, আইনি বিশ্লেষণ এবং রায়ের ভিত্তি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সাধারণত সময়সাপেক্ষ। সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ আইন, আদালতের সিদ্ধান্ত, বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপর পুরো প্রক্রিয়া নির্ভর করে। ফলে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানো হলেও বাস্তবে প্রত্যর্পণ সম্পন্ন হতে একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হতে পারে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে বিচারিক সহযোগিতা, পারস্পরিক আইনি সহায়তা এবং বিদ্যমান সম্পর্ক এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকারসংক্রান্ত বিধানের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ফলে বাংলাদেশের অনুরোধের পর ভারত সরকার কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেয়, তা ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই মামলার রায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকার বলছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের লক্ষ্য। অন্যদিকে, এ ধরনের মামলার বিচার, রায় এবং বাস্তবায়ন নিয়ে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন মতামত ও প্রতিক্রিয়াও অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের সর্বশেষ পদক্ষেপের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, আদালতের দেওয়া রায় কার্যকর করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখা হবে। এখন ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করবে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য অগ্রগতি।