প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের নতুন করে মেরুকরণ ও উদ্বেগের সুর ধ্বনিত হচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশের ভবিষ্যৎ এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে যখন নতুন করে পথচলা শুরু হয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক উত্থানকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে জামায়াতের কৌশলগত অবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা যেন নুরের এই সতর্কবার্তার মধ্য দিয়ে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় তিনি দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক মহলকে জামায়াতের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
‘রক্তস্নাত জুলাই: প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই আলোচনা সভায় নুর অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে, জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশল দেশের স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াত বাইরে সরকারবিরোধী সুর চড়া রাখলেও নেপথ্যে ভিন্ন এক রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির চেষ্টা করছে। তার মতে, জনগণের আবেগ ও উত্তেজনাকে পুঁজি করে এক ধরনের উসকানিমূলক পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিনের ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পথ সুগম করে দিতে পারে। এই দ্বিমুখী রাজনৈতিক চরিত্রের পেছনে গভীর কোনো কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা নিয়েও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। নুরের এই পর্যবেক্ষণ রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যেখানে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কর্মকাণ্ডের মধ্যকার অমিলগুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে আলোকপাত করতে গিয়ে নুরুল হক নুর বলেন, বিপ্লবের পর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জামায়াতপন্থীদের পদায়ন একটি পরিকল্পিত এজেন্ডার অংশ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদ, জ্বালানি খাত থেকে শুরু করে বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রগুলোতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে বলে তিনি দাবি করেন। ছাত্রদের আবেগকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কাঠামোতে এই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা জুলাই আন্দোলনের মূল চেতনার পরিপন্থী। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুপরিকল্পিত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করার যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা ভয়ংকর। সেখানে বাস্তবতার সঙ্গে প্রচারের কোনো মিল নেই, বরং এক ধরনের কৃত্রিম জনপ্রয়তা তৈরির মাধ্যমে জামায়াতকে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী নুর তার বক্তব্যে তরুণ প্রজন্মের রাজনীতিতে আসার পথ ও চ্যালেঞ্জ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন। জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের একটি অংশ রাজনৈতিক পরিপক্বতা অর্জনের আগেই জামায়াতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, নতুন একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার যে সম্ভাবনা জুলাই বিপ্লবে সৃষ্টি হয়েছিল, তা জামায়াতের এই কৌশলগত আধিপত্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদি তরুণ সমাজ নতুন রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ার পরিবর্তে পুরোনো কোনো রাজনৈতিক দর্শনের প্রক্সি বা ছায়া হিসেবে কাজ করে, তবে সেই বিপ্লবের লক্ষ্য কখনো সফল হতে পারে না। জামায়াতের সমর্থক গোষ্ঠী তাদের অবস্থানে অবিচল থাকলেও নতুন করে আরেকটি প্রক্সি রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হলে তা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য এক বড় সংকটের বার্তা বহন করবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপট টেনে নুর বলেন, বাংলাদেশের অস্থির পরিস্থিতিকে ব্যবহার করার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পক্ষ সর্বদা তৎপর। আন্দোলনের আগে ও পরে যেভাবে বিভিন্ন শক্তি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে পুঁজি করেছে, তা সার্বভৌমত্বের জন্য উদ্বেগের। তার মতে, জামায়াতকে সামনে রেখে দেশে উগ্রবাদের উত্থানের একটি বয়ান বা ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের অভ্যন্তরে নতুন রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির উর্বর ক্ষেত্র হতে পারে। উগ্রবাদের এই অজুহাত ব্যবহার করে দেশি-বিদেশি চক্র রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে জামায়াতের মতো দলগুলোর রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে জাতীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ঐকমত্য গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তারাও দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজস্ব মতামত তুলে ধরেন। নুরুল হক নুরের এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক দলের সমালোচনা নয়, বরং তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এক সচেতন সতর্কবার্তা দিয়েছেন। গণঅভ্যুত্থানের পর যখন দেশ নতুন এক স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় গ্রহণ করেছে, তখন যেকোনো ধরনের ষড়যন্ত্র বা উগ্রবাদী রাজনৈতিক উত্থান সেই স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। তাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং তরুণ সমাজকে সঠিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তার মতে, দেশের মানুষ রক্ত দিয়ে যে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব এখন রাজনৈতিক দলগুলোর এবং প্রতিটি নাগরিকের। জামায়াতের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য এবং সচেতনতাই এখন বাংলাদেশকে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারে বলে তিনি মনে করেন।