পীরগাছায় স্টেডিয়াম নির্মাণে অনিয়ম, তদন্তে মাঠে কমিটি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৮ বার
পীরগাছায় স্টেডিয়াম নির্মাণে অনিয়ম, তদন্তে মাঠে কমিটি

প্রকাশ: ২০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় তরুণ প্রজন্মের ক্রীড়া প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে যে স্বপ্ন নিয়ে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা এখন চরম অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগে হোঁচট খেয়েছে। প্রায় ৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকার এই বিশাল প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ঘিরে শুরু থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছিল। অবশেষে নির্মাণের মান নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে এবং এলাকাবাসীর আন্দোলনের চাপে পড়ে উপজেলা প্রশাসন তিন সদস্যের একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। নির্মাণকাজের শিডিউল অনুযায়ী নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কমিটিকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

প্রকল্পটির কাজের গুণগত মান নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রতিটি পর্যায়ে চরম অবহেলা ও ফাঁকিবাজি করা হচ্ছে। বিশেষ করে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ইটের গুণগত মান অত্যন্ত নিম্নমানের এবং ভিটি ভরাট করার ক্ষেত্রে সাধারণ বালুর পরিবর্তে অত্যন্ত নিম্নস্তরের বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়াও রডের ব্যবহারে নকশা ও শিডিউলের ব্যত্যয় এবং সিমেন্টের পরিমাণের ক্ষেত্রে কার্পণ্য করার মতো ഗുരുতর অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ মানুষের এসব অভিযোগ যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন ঠিকাদারপক্ষের লোকজন উল্টো এলাকাবাসীর ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করে। এর জেরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি এবং স্থানীয়রা ক্ষোভে পীরগাছা-রংপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানান। এই অস্থির পরিস্থিতির পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন গত রবিবার বিকেলে এই তদন্ত কমিটি গঠনের অফিস আদেশ জারি করেন। উপজেলা প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান জেমিকে এই কমিটির আহ্বায়ক মনোনীত করা হয়েছে। এছাড়া কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী সানোয়ার মোর্শেদ এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই প্রকল্পের তদন্তের জন্য কমিটিকে সরেজমিন পরিদর্শন করে তথ্যভিত্তিক মতামতসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত স্টেডিয়াম নির্মাণের সকল ধরনের কাজ স্থগিত থাকবে। এই সিদ্ধান্তকে এলাকাবাসী স্বাগত জানালেও তাদের দাবি, কাজের স্থগিতাদেশই যথেষ্ট নয়, বরং ভবিষ্যতে যেন এই ধরনের দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য দায়ীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পটিকে ঘিরে স্থানীয়দের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। পীরগাছার মতো একটি জনপদ যেখানে খেলাধুলা ও শারীরিক কসরতের জন্য উপযুক্ত কোনো অবকাঠামো নেই, সেখানে এমন একটি স্টেডিয়াম হওয়ার কথা ছিল তাদের গর্বের প্রতীক। কিন্তু প্রকল্পের শুরু থেকেই নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় মানুষের সেই স্বপ্ন আজ ধূলিসাৎ হওয়ার উপক্রম। স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, ঠিকাদাররা হয়তো প্রশাসনের নজর এড়িয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ খুঁজছিলেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের সজাগ দৃষ্টির কারণে আজ এই দুর্নীতি জনসম্মুখে চলে এসেছে। শুধু তাই নয়, স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।

তদন্ত কমিটির দায়িত্ব কেবল অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখাই নয়, বরং নির্মাণশৈলীর প্রতিটি ক্ষেত্রে শিডিউল অনুযায়ী কাজ হয়েছে কি না, তা কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা। প্রকল্পের শুরু থেকে এ পর্যন্ত যা যা কাজ হয়েছে, তার একটি পূর্ণাঙ্গ অডিট বা স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন অত্যন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল। দুর্নীতিবাজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এছাড়া প্রকল্পের অর্থায়নের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তদারকির ঘাটতি ছিল কি না, তাও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।

পীরগাছায় স্টেডিয়াম নির্মাণে অনিয়মের এই ঘটনাটি কেবল একটি একক উদাহরণ নয়, বরং সারা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দুর্নীতির একটি প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্রীয় অর্থে যখন কোনো অবকাঠামো তৈরি করা হয়, তখন তার স্থায়িত্ব এবং মান রক্ষা করা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায় শুধু ঠিকাদারের নয়, বরং তদারককারী সংস্থার ওপরও বর্তায়। এখন এলাকাবাসী এবং সচেতন নাগরিকরা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তারা আশা করছেন, কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপের মুখে না পড়ে কমিটি তাদের রিপোর্ট প্রদান করবে এবং সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই সরকার জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

পরিশেষে বলা যায়, পীরগাছার এই মিনি স্টেডিয়ামটি যদি সঠিক মানে নির্মিত হয়, তবেই এটি স্থানীয় যুবসমাজের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠবে। সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যেন সাধারণ মানুষের করের টাকার অপচয় না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই হোক এই তদন্তের মূল উদ্দেশ্য। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান কেবল পীরগাছায় নয়, বরং দেশের প্রতিটি উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ুক, এমনটাই প্রত্যাশা দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের। একটি স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গড়ার পথে সরকারি প্রতিটি প্রকল্প যেন সততার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়, সেই আহ্বানই আজ ধ্বনিত হচ্ছে প্রতিটি সচেতন নাগরিকের কণ্ঠে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত