তিস্তায় পানি বৃদ্ধি, খুলে দেওয়া হলো ৪৪ জলকপাট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬
  • ৪৪ বার
তিস্তায় পানি বৃদ্ধি, খুলে দেওয়া হলো ৪৪ জলকপাট

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদী তিস্তার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সোমবার (২০ জুলাই) সকালে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানির উচ্চতা বিপৎসীমার মাত্র ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। ফলে তিস্তা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

পাউবো ডালিয়া ডিভিশনের তিস্তা নদীর পানি পরিমাপক নুরুল ইসলাম জানান, সোমবার সকাল ৯টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানির সমতল রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক ১০ মিটার। এই পয়েন্টে বিপৎসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। অর্থাৎ নদীর পানি বিপৎসীমার মাত্র ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই দিন সকাল ৬টায়ও পানির উচ্চতা একই পর্যায়ে ছিল, যা পরিস্থিতির স্থিতিশীল হলেও উদ্বেগজনক অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।

পাউবো ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, উজান থেকে আসা পানির চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যারাজে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। সেই চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ব্যারাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় আগামী কয়েক ঘণ্টা থেকে এক দিনের মধ্যে তিস্তার পানির প্রবাহ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আবহাওয়া বিশ্লেষকদের মতে, বর্ষা মৌসুমে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক ঘটনা হলেও, উজানে অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢল একসঙ্গে দেখা দিলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোতে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পানির উচ্চতায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিয়মিত পানি পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করছে।

তিস্তা ব্যারাজ বাংলাদেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্পগুলোর অন্যতম। নীলফামারীর ডালিয়ায় অবস্থিত এই ব্যারাজের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণেও ব্যারাজটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হলে ব্যারাজের জলকপাট খুলে দিয়ে পানি দ্রুত নিচের দিকে প্রবাহিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যাতে কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত কয়েক দিন ধরে তিস্তার পানি ধীরে ধীরে বাড়ছিল। সোমবার সকালে নদীর স্রোত আরও তীব্র হতে দেখা গেছে। নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের কিছু চরাঞ্চলে পানি ঢুকতে শুরু করেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। যদিও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের বন্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি, তবে পানি আরও বাড়লে কৃষিজমি, বসতভিটা এবং কাঁচা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সময় অনেক এলাকায় আমন ধানের চারা রোপণের প্রস্তুতি চলছে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে কৃষকদের ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। এছাড়া নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগও বাড়ছে। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, তিস্তার পানি হঠাৎ বৃদ্ধি পেলে অনেক এলাকায় নদীভাঙনের ঘটনাও ঘটে।

এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতির ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নদীতীরবর্তী মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। নৌযান চলাচল, মাছ ধরার কার্যক্রম এবং নদীতে অপ্রয়োজনীয় চলাচলে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে আগামী কয়েক দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এর প্রভাবে তিস্তা ছাড়াও ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা অববাহিকার নদীগুলোর পানির স্তর বাড়তে পারে। তবে কোথাও কোথাও পানি দ্রুত বাড়লেও পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি এবং আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের ঘটনা আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে নদী ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং আন্তঃসীমান্ত পানি তথ্য আদান-প্রদানের গুরুত্বও বেড়েছে। তারা মনে করেন, উজানের পানিপ্রবাহ সম্পর্কে দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য পাওয়া গেলে সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, তিস্তা নদীর পানির উচ্চতা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে জানানো হবে। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী মানুষকে গুজবে কান না দিয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, তিস্তা নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও ব্যবধান অত্যন্ত কম। তাই উজানে আরও ভারী বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত