ডলারের দাম বাড়লেও বাড়ছে রিজার্ভ, কেন উদ্বেগ?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৭ বার
ডলারের দাম বাড়লেও বাড়ছে রিজার্ভ, কেন উদ্বেগ?

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তির চিত্র থাকলেও ডলারের বিনিময় হার আবারও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে এবং বাজারে ডলারের সরবরাহও আগের তুলনায় স্বাভাবিক। তবুও গত এক সপ্তাহে আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের দাম ৭৫ পয়সা বেড়ে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সায় পৌঁছেছে। সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে ডলারের দাম বেড়েছে ১ টাকা ৩০ পয়সা। এ অবস্থায় ডলারের দামের পেছনে প্রকৃত কারণ খুঁজতে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ নেই। ব্যাংকগুলো নিজেদের চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে ডলার কেনাবেচা করছে। তবে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কোনো ধরনের অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা বাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে কয়েকটি বিশেষ তদারকি দল গঠন করা হচ্ছে। এসব দল দেশের শীর্ষ ডলার লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোর দৈনিক লেনদেন, বড় অঙ্কের বৈদেশিক পরিশোধ এবং নিট ওপেন পজিশন (এনওপি) পর্যালোচনা করবে।

সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, ডলারের দাম বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি আমদানির বিল, বিদেশি ঋণের কিস্তি এবং অন্যান্য বড় পরিশোধের সময় ঘনিয়ে আসায় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সাময়িকভাবে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। একই সময়ে রপ্তানি আয়ে কিছুটা নিম্নগতি এবং আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ডলারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। ফলে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও মূল্য কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ডলার বাজারে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ধরনের মূল্য নির্ধারণ বা সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে না। ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে বাজারভিত্তিক লেনদেন পরিচালনা করছে। তবে কোনো ব্যাংক যদি অনৈতিক বা অস্বাভাবিক কার্যক্রমের মাধ্যমে বাজারে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, বড় অঙ্কের কিছু বৈদেশিক পরিশোধের কারণে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে, তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশাবাদী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রায় দেড় বছর আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দাম ১২১ থেকে ১২২ টাকা ৩০ পয়সার মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। তবে জাতীয় নির্বাচনের পর ধীরে ধীরে এই হার বাড়তে শুরু করে। চলতি বছরের মার্চে প্রতি ডলারের দাম ১২২ টাকা ৩০ পয়সা থেকে বেড়ে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় ওঠে। এরপর জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত সেই হার অপরিবর্তিত থাকলেও জুনের শেষ থেকে আবার দাম বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের দাম ১২৩ টাকা ৬০ পয়সায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে রেমিট্যান্স ও আমদানি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংক দামের তুলনায় ২০ থেকে ২৫ পয়সা বেশি দামে ডলার সংগ্রহ করছে।

বেসরকারি খাতের ব্যাংকারদেরও একই ধরনের মূল্যায়ন রয়েছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সাময়িক বড় অঙ্কের বৈদেশিক পরিশোধের কারণে ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আগের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে এবং রপ্তানি আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। বিপরীতে আমদানি কার্যক্রম বাড়তে থাকায় বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব বিনিময় হারে পড়েছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে সরকারের আলোচনা চলমান রয়েছে। সম্প্রতি সংস্থাটির একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি কাঠামো যৌক্তিক করার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে এসব আলোচনার সময় বাজারে কৃত্রিমভাবে বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ না করে স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এরও কিছু প্রভাব বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে।

তবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্রে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ। আগের অর্থবছরের তুলনায় রেমিট্যান্স বেড়েছে ৫২৬ কোটি ডলার বা ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এই শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং ডলার সরবরাহকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সরবরাহ বেশি থাকলেই ডলারের দাম কমবে—এমন ধারণা সব সময় বাস্তবসম্মত নয়। বাজারে ভবিষ্যৎ চাহিদার প্রত্যাশা, আমদানি ব্যয়ের চাপ, আন্তর্জাতিক ঋণ পরিশোধের সময়সূচি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের আচরণও বিনিময় হার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা মূল্যবৃদ্ধি হলেও দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ ইতিবাচক থাকলে বাজার আবারও স্থিতিশীল হতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজারে স্বচ্ছতা ও আস্থা বজায় রাখা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি জোরদার হলে কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট বা অনিয়ম প্রতিরোধ করা সহজ হবে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও উৎসাহিত করা এবং আমদানি ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য বজায় রাখা গেলে ডলারের বাজার দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ আমদানিকারক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তাদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হলেও অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলো এখনো তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। তাই বাজার পরিস্থিতির ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিবিড় নজরদারি এবং সরকারের চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম আগামী দিনে ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত