প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতাই নয়, এটি এখন বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক আয়োজনও। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজিত ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে নতুন চ্যাম্পিয়ন স্পেনের হাতে শিরোপা ওঠার মধ্য দিয়ে। মাঠের রোমাঞ্চ, নাটকীয়তা এবং কোটি কোটি দর্শকের উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি এবার আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ পুরস্কার। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এই আসরের জন্য ইতিহাসের সর্বোচ্চ প্রাইজমানি ঘোষণা করেছিল, যার ফলে টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া প্রতিটি দলই উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুবিধা পেয়েছে।
নিউ জার্সির ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয় করে স্পেন। ২০১০ সালের পর দীর্ঘ ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করে লা রোহা। এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পুরস্কার হিসেবে স্পেন পাবে ৫ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৬১৫ কোটি টাকা। শিরোপার সঙ্গে এই বিপুল আর্থিক পুরস্কার স্পেনের ফুটবল উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ফাইনালে হেরে রানার্সআপ হওয়া লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাও বড় অঙ্কের অর্থ পুরস্কার পাচ্ছে। দলটি পাবে ৩ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০৬ কোটি টাকার সমান। টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার কৃতিত্বের পাশাপাশি এই অর্থ পুরস্কারও আর্জেন্টাইন ফুটবলের জন্য বড় প্রাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তৃতীয় স্থান অধিকার করা ইংল্যান্ডের জন্য নির্ধারিত হয়েছে ২ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩৫৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে চতুর্থ হওয়া ফ্রান্স পাবে ২ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৩২ কোটি টাকা। ইউরোপের চার শক্তিশালী দলের এই সাফল্য আবারও প্রমাণ করেছে যে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইউরোপীয় দেশগুলোর আধিপত্য এখনো দৃঢ়ভাবে বজায় রয়েছে।
ফিফার প্রাইজমানি কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে নকআউট পর্বে যত দূর এগোনো যায়, তত বেশি আর্থিক পুরস্কার নিশ্চিত হয়। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়া চারটি দল প্রত্যেকে পাবে ১ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৩৩ কোটি টাকা। শেষ ষোলোতে বিদায় নেওয়া আটটি দল পাবে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা প্রায় ১৮৪ কোটি টাকা করে। অন্যদিকে শেষ ৩২ থেকে বিদায় নেওয়া ১৬টি দল প্রত্যেকে পাবে ১ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার, যার মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা।
গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়া দলগুলোকেও খালি হাতে ফিরতে হয়নি। প্রতিটি দলকে ৯০ লাখ মার্কিন ডলার করে প্রাইজমানি দিয়েছে ফিফা। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১১০ কোটি টাকা। এর মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণই একটি বড় অর্জন এবং প্রতিটি দেশের প্রস্তুতি ও বিনিয়োগকে মূল্যায়ন করা হবে।
এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রতিটি দলকে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই অতিরিক্ত ১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার করে প্রদান করা হয়েছে। এই অর্থ দলের প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, ভ্রমণ, আবাসন, চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সাংগঠনিক ব্যয় নির্বাহে ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো। ফলে তুলনামূলক ছোট ফুটবল শক্তিগুলোর জন্যও বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া আর্থিকভাবে অনেক বেশি লাভজনক হয়ে উঠেছে।
বিশ্বকাপ শুরুর প্রায় দুই মাস আগে ফিফা প্রাইজমানি ১৫ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। ৪৮ দলের সম্প্রসারিত এই আসরে মোট পুরস্কার তহবিল নির্ধারণ করা হয় ৮৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ১২ পয়সা ধরে বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রাইজমানির রেকর্ড। ফিফার মতে, বিশ্ব ফুটবলের বিকাশে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং প্রতিযোগিতাকে আরও আকর্ষণীয় করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপের প্রাইজমানি এখন শুধু বিজয়ী নির্ধারণের পুরস্কার নয়, বরং একটি দেশের ফুটবল ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ উন্নয়নের বড় অর্থনৈতিক ভিত্তি। এই অর্থ দিয়ে অনেক দেশ নতুন একাডেমি গড়ে তোলা, যুব ফুটবলে বিনিয়োগ, নারী ফুটবল উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ফুটবল ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার সুযোগ পায়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ফুটবল দেশগুলোর জন্য বিশ্বকাপ থেকে পাওয়া অর্থ দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দর্শক উপস্থিতি এবং সম্প্রসারিত অংশগ্রহণের কারণে যেমন ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে, তেমনি রেকর্ড প্রাইজমানির কারণেও এটি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। স্পেনের বিশ্বজয়, আর্জেন্টিনার লড়াই, ইউরোপীয় দলগুলোর আধিপত্য এবং অংশগ্রহণকারী সব দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক পুরস্কার—সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলকে আরও বৈশ্বিক এবং অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আগামী বিশ্বকাপগুলোতে প্রাইজমানির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলেও ধারণা করছেন ক্রীড়া অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।