প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
করোনা মহামারির সময় ভুয়া করোনা পরীক্ষার সনদ, প্রতারণা ও নানা আলোচিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ করিম ওরফে সাহেদকে আবারও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, একাধিক মামলায় জামিন এবং কারামুক্তির প্রায় দুই বছর পর তাঁর এই পুনরায় গ্রেপ্তার দেশের আলোচিত অপরাধগুলোর বিচার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
সোমবার (২০ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকা থেকে সাহেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগরের ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসান। তিনি জানান, সাহেদের বিরুদ্ধে একটি মামলায় আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে তাঁকে আটক করা হয়েছে। পল্লবী থানার পুলিশের আবেদনের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
মো. সাহেদের নাম প্রথম আলোচনায় আসে ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়। সে সময় রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত রিজেন্ট হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার নামে ব্যাপক অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, বহু ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ না করেই ভুয়া করোনা পরীক্ষার সনদ দেওয়া হয়েছে এবং এই প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে সংঘটিত এই জালিয়াতি দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।
২০২০ সালের ৭ জুলাই র্যাব উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভুয়া করোনা পরীক্ষার সনদ, অনিয়মের প্রমাণ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় র্যাব বাদী হয়ে সাহেদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করে। মামলার মাত্র নয় দিনের মাথায় ১৫ জুলাই সাতক্ষীরা সীমান্ত এলাকা থেকে সাহেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে নিয়ে পরিচালিত অভিযানে একটি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়, যা তাঁর বিরুদ্ধে আরও একটি মামলার ভিত্তি তৈরি করে।
এরপর একে একে প্রতারণা, জালিয়াতি, অস্ত্র, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মোট ৩৫টি মামলা হয়। এসব মামলার অনেকগুলোতে তদন্ত, বিচার ও আপিল প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন মামলায় তিনি জামিন লাভ করেন এবং ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কারাগার থেকে মুক্তি পান। সে সময় তাঁর মুক্তি নিয়েও ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
সাহেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের মামলাটি বিশেষভাবে আলোচিত ছিল। ২০২০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর এই মামলায় তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। তবে তিনি ওই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি হাইকোর্ট তাঁকে খালাস দেন। পরে একই বছরের ১৪ জানুয়ারি আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত হাইকোর্টের ওই রায় স্থগিত করেন। ফলে মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া নতুন করে গুরুত্ব পায়।
অন্যদিকে, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় ২০২৩ সালের ২১ আগস্ট তাঁকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া তাঁর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস আরও পুরোনো। ২০১০ সালে একটি চেক জালিয়াতির মামলায়ও তাঁর ছয় মাসের কারাদণ্ড হয়েছিল। অর্থাৎ করোনা মহামারির আগেই তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণাসংক্রান্ত অভিযোগ ও বিচারিক রেকর্ড ছিল।
সাহেদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনে দায়ের করা মামলাটিও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত শেষে আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, বিভিন্ন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি ১১ কোটিরও বেশি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। শুধু করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদ দিয়েই তিনি ৩ কোটি ১১ লাখ ৯০ হাজার ২২৭ টাকা অবৈধভাবে আদায় করেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও তদন্তে উঠে আসে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাহেদের পুনরায় গ্রেপ্তার প্রমাণ করে যে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম চলমান থাকে। কোনো মামলায় জামিন পাওয়া মানেই অন্য সব মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থেকে মুক্তি নয়। নতুন বা পূর্বের কোনো মামলায় আদালতের নির্দেশ থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা কার্যকর করতে বাধ্য।
করোনা মহামারির সময় রিজেন্ট হাসপাতাল কাণ্ড শুধু একটি প্রতারণার ঘটনা ছিল না; এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং জনবিশ্বাসের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। ভুয়া করোনা সনদের কারণে অনেক মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছেন এবং জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। এ কারণে ঘটনাটি দেশের অন্যতম আলোচিত অপরাধ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।
বর্তমানে সাহেদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান মামলাগুলোর বিচারিক অগ্রগতি এবং সর্বশেষ গ্রেপ্তারের পর আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকেই নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। পুলিশ জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য মামলার অবস্থাও পর্যালোচনা করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বহুল আলোচিত এই মামলাগুলোর স্বচ্ছ ও দ্রুত নিষ্পত্তি শুধু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে না, বরং আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও আরও সুদৃঢ় করবে। বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য ও আর্থিক প্রতারণার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারিক কার্যক্রমের কার্যকর বাস্তবায়ন ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।