জ্বালানি আমদানির ব্যয়ে রিজার্ভে চাপ: মন্ত্রীর সতর্কবার্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৯ বার
জ্বালানি আমদানির ব্যয়ে রিজার্ভে চাপ: মন্ত্রীর সতর্কবার্তা

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। বৈশ্বিক অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে এই ব্যয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দেশীয় জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানে আরও জোর দেওয়ার আহ্বান জানান।

সোমবার (২০ জুলাই) সকালে রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এনডিপি) আয়োজিত ‘উন্নয়ন কণ্ঠস্বর’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে জ্বালানি খাতের বর্তমান বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন তিনি।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য এখনো অস্থিতিশীল। আন্তর্জাতিক সংঘাত, বিশেষ করে বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ওপর। সরকার জনগণের কাছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রেখেছে। তবে এই অতিরিক্ত ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

মন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিপুল পরিমাণ এলএনজি, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং অন্যান্য জ্বালানি আমদানি করতে হয়েছে। এসব আমদানিতে ইতোমধ্যে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে এই ব্যয় অনিবার্য হলেও দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানোই হবে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

বক্তব্যে তিনি আগের সরকারের জ্বালানি নীতিরও সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে বিজয়ের মাধ্যমে সামুদ্রিক সম্পদের অধিকার অর্জিত হলেও সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো ইতোমধ্যে গভীর সমুদ্রে জ্বালানি অনুসন্ধান ও উত্তোলনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। অথচ বাংলাদেশ এখনো সেই সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারেনি। ফলে দেশকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমাতে সৌর, বায়ু এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

সরকারের চলমান পরিকল্পনার বিষয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, দেশে ১০ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও এই খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তাঁর মতে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে পারলে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

তিনি বলেন, ব্যক্তি পর্যায়ে এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন ধরনের কর-সুবিধা ও শিথিল নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রণোদনা উদ্যোক্তাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে বলে সরকার আশা করছে। পাশাপাশি সরকারি ভবন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক এলাকায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও সম্প্রসারণ করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ এখনো আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি পেলেই দেশের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখতে শুধু রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাড়ালেই হবে না, আমদানি ব্যয়ও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে বিকল্প উৎসের উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। এতে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমবে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও হ্রাস পাবে।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন বিশেষজ্ঞও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এখন আর শুধু পরিবেশগত প্রয়োজন নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও অন্যতম শর্ত। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্যকর নীতিমালার মাধ্যমে বাংলাদেশ এ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারে।

জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর তার প্রভাব নিয়ে সরকারের এই মূল্যায়ন এমন এক সময় সামনে এলো, যখন বিশ্ব অর্থনীতি এখনো বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলা করছে। এ অবস্থায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সরকার যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধান এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, তা দেশের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত