প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মাগুরার শ্রীপুর উপজেলায় এক স্কুলছাত্রীকে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হাসান শেখ (৩০) নামে এক যুবককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তদন্তের ভিত্তিতে আদালত রায়ে বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আসামির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। বহুল আলোচিত এ মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। তবে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডের এই রায় উচ্চ আদালতে অনুমোদন এবং আপিলসহ পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কার্যকর হবে।
সোমবার (২০ জুলাই) মাগুরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে এই রায় ঘোষণা করেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, তদন্তে সংগৃহীত আলামত, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করে আদালত এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন জানান, ঘটনাটি ঘটে ২০২২ সালের ১৭ মার্চ। সে সময় শ্রীপুর উপজেলার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী রাজিয়া খাতুন নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে এলাকায় খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে তাঁর মরদেহ পাশের একটি বাঁশঝাড়ে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, আসামি হাসান শেখ প্রথমে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। অভিযোগে বলা হয়, সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি শ্বাসরোধ করে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলায় আঘাত করে শিশুটিকে হত্যা করেন। পরে ঘটনাটি আড়াল করার উদ্দেশ্যে মরদেহ একটি বাঁশবাগানে ফেলে রেখে চলে যান। ঘটনার পর শ্রীপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব না হলেও পরে মামলাটির তদন্তভার অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সিআইডি ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামত, ফরেনসিক পরীক্ষা, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং অন্যান্য তদন্ত উপাদান বিশ্লেষণ করে হাসান শেখকে শনাক্ত করে। তদন্ত শেষে তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে মোট ১১ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। তাঁদের সাক্ষ্য, তদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনার পর আদালত মনে করেন যে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর ভিত্তিতেই বিচারক আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।
রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, এই রায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, উচ্চ আদালতের প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে রায় কার্যকর হবে। তাঁর মতে, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার এবং কার্যকর শাস্তি সমাজে ইতিবাচক বার্তা দেবে।
অন্যদিকে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চ আদালতে অনুমোদনের জন্য যায়। পাশাপাশি দণ্ডিত ব্যক্তি আইন অনুযায়ী আপিল এবং রিভিউ আবেদন করার সুযোগ পান। ফলে নিম্ন আদালতের রায়ই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়; পরবর্তী বিচারিক ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পরই রায় কার্যকর হওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত হয়।
শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সমাজে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু বিচার নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশুদের নিরাপত্তা এবং দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করাও জরুরি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ ধরনের অপরাধ কার্যকরভাবে কমানো সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচিত এ মামলায় আদালতের রায় বিচারপ্রত্যাশীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তবে একই সঙ্গে তদন্তের মান উন্নয়ন, ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিচারপ্রক্রিয়া আরও দ্রুত সম্পন্ন করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ সময়মতো ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলে অপরাধ দমনে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
মাগুরার শ্রীপুরে সংঘটিত এই মর্মান্তিক ঘটনায় একটি পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ চিরতরে থেমে গেছে। আদালতের রায় সেই শোক মুছে দিতে না পারলেও আইনগতভাবে বিচার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন উচ্চ আদালতের পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট সবার।